Pagesবিষয় কাশ্মীর অনেকদিন ভাটাইনি, নিজের প্রচন্ড ব্যস্ততা সাথে কিছু মনের খিচখিচানিতে লিখতে মন করছি

Sunday, August 18, 2019

বিষয় কাশ্মীর

বিষয় কাশ্মীর অনেকদিন ভাটাইনি, নিজের প্রচন্ড ব্যস্ততা সাথে কিছু মনের খিচখিচানিতে লিখতে মন করছিল না। আমি যখন শিফটিং নিয়ে ব্যস্ত কাশ্মীর নিয়ে কত কি হয়ে গেল। কি হল, কেন হল, ভালো না মন্দ এসব অনুধাবন করার জন্য খুব সামান্য আমি, আর আমার ভাবনা বাকিদের সাথে মিলবেও না হয়ত। তবে ২০০৭-৮ এ কাশ্মীর ভ্রমণ টা জীবনের অন্যকিছু পাওয়ার মধ্যে একটা এটাই ভাবি আমি। খুব কাছ থেকে যে গুলো দেখেছি সেগুলোই বলতে মন করছে। রাজনীতি বুঝি না। ভালো মন্দ এমনিই কম বুঝি। আমরা চারজন, আমাদের দুদিকের বাবা মা আর সাথে আমাদের বন্ধু পরিবার, প্রণবদা, অজন্তা আর তাদের দুই ছেলে, সব মিলিয়ে বারো জন গেছিলাম। আমাদের বেশির ভাগ থাকার ব্যবস্থা করেন আমার হাওড়া বাড়ির তিন পুরুষের শাল বিক্রেতা রফিক ভাই। রফিকের বাবাও আসতেন এক কালে আমাদের বাড়ি। মা বাড়ি বদলেছে রফিক সেখানেও যায় মাঝে সাঝে। সম্পর্ক কতটা ভরসার হলে সেই সময় রফিক কে দিয়ে আমরা এসব উপকার নিই সেটা বোঝাতে চাইছি আর কি। বেশ মনে আছে রফিক ভাই জম্মু থেকেই আমাদের সাথে যোগাযোগ করে, একটা আলাদা সিম দিয়ে হোটেলের কাগজ টাগজ দিয়ে দেন। সে সময় মোবাইল এত ছড়ায়নি, রোমিং কাটতো বেশ, তাই ওই লোকাল সিম টা যে খুব উপকারে লেগেছিল বলাই বাহুল্য। ডাল লেকের একদম কাছে একটি হোটেল, বলাবাহুল্য তার নামটাও হিন্দু মার্কা কোনো ঠাকুর দেবতা সংক্রান্ত ছিল, সেটির চারটি ঘর আমাদের জন্য আর খুব যথাযথ খরচায় আমরা ছিলাম। আমরা কেউ মহাপুরুষ নই, তাই এই বারো জনের বারো রকম বায়নাক্কা, তায় আবার বেড়াতে এসেছি। ছেলে মেয়েরা কিছুটা বাপ মা বাড়ি পরিবার দ্বারা চালিত। বেশ ছোট তখন। তবু ওতেই বাচ্চারা চিরকাল এডভান্স থাকেই। আবার সাথে প্রাচীন প্রবীণরাও। আর জায়গা কাশ্মীর। সোজাসুজিই বলি, আমার শাশু মা সেই গোত্রে পরেন যেখানে মুসলিম হোটেল? তাদের খাবার? এসব নিয়ে নাক উঁচুপনা ছিল। তাই চারবেলা খাবার জন্য যেমন ভাবতে হয়েছে তেমন আরো অনেক কিছু নিয়েই একটু বুঝে চলতে হয়েছিল। আমরা ফেসবুকে এসে সবাই খুব উদার হয়ে যেতে পারি, কিন্তু ঘরের গল্পগুলো তবু থাকেই। সেই সময় অনেক দিন বন্ধ থাকার পরে আবার কাশ্মীর খুলেছে। তাই ড্রাইভার, হোটেল বয়, শিকারার চালক সবাইকেই আমরা গোগ্রাসে গিলতে চেষ্টা করেছি। আমরা তো সেই সবজান্তা বাঙালি রে বাবা। আমি বেশ ভুলো তাই সব মনে নেই আর, যে টুকু আছে সেগুলো বলি। প্রথম ড্রাইভার ছিলেন একজন টাক মাথা ভদ্রলোক। তাঁকে এক রাশ কৌতূহল নিয়ে কত প্রশ্ন করতে করতে আসি আমরা। কোথাও খুব বেমানান কিছু পাই নি। যে টার যেমন উত্তর তেমনই দিচ্ছিলেন। এরপর ওই হোটেলের মানুষগুলি, সবাই হয়ত মুসলিম কিন্তু কি ভালো মানুষ সে আজো মনে আছে। আমি রোজ খুব ভোরে উঠে ডাল লেকে যেতাম একাই। সামনে রাস্তা পেরোলেই লেক। ওনাদের গেট বন্ধ থাকতো।কিন্তু রোজ খুলে দিতেন আমি গেলেই। সে সময় অর্কুটের জামানা। প্রথম সেই ডিজি ক্যাম হাতে। যা দেখি সব ক্যাম বন্দী করতে মন করে। সূর্যোদয়ের ছবি ভিডিও কিছু ছাড়িনি। রাস্তায় কত মানুষ। কেউ জগিং করছেন, কেউ হাঁটছেন কেউ ছবি তুলছেন আমার মত। তবে স্থানে স্থানে আমাদের ফুল বডি সার্চ বা প্রায় সর্বত্র সিকিউরিটি দাঁড়িয়ে এগুলো ছিলোই। আমরা এক একদিন এক এক দিকে খেতে যেতাম। বড় হোটেল থেকে শুরু করে ছোট গুমটি সবেতেই খেতাম। শাশু মা কে তেমন হলে একেক দিন বৈষ্ণব ধাবাতে খাইয়ে আমরা এদিক সেদিক খেয়েছি। দেখেছি ঠ্যালায় কাবাব এটা সেটা বিক্রি হচ্ছে। আমার নিজের তেমন কোনো ব্যাপার না থাকলেও মা বাবাদের সেই চোখ বোজা শাসনের জন্য ওসব চেখে দেখা হয়নি যদিও সে যাত্রায়। তবে সব জায়গায় এত দারুণ খাবার খেতাম যে কি বলবো। একটা ছোট গুমটি তে ডিমের ওমলেট আর ব্রেডের নেশায় পরে গেছিলাম। সব জায়গাতেই আমার অন্তত টার্গেট ছিল লোকাল মানুষ। বেড়াতে গেলেই নিবেদিতা স্কুল, ভূগোলের মানসীদিকে খুব মনে হয়। দিদি আজ আর নেই, কিন্তু দিদির দৌলতে কিছু শিক্ষা এমন বপন করেছি যে কোনো জায়গায় গেলেই কিছু সার্ভে করা, সেখানের সব গল্প খুব টানে আমায় চিরকাল। সেই নেশাতেই সবার সাথে কথা বলেছি। কেনাকাটার দোকানে গিয়ে যে সব মানুষ পেয়েছি তাঁদের সাথেও খুব বকেছি। কি করে এসব বানায়, এটা ওটা সেটা কত কি। শিকারার চালকদের জীবন ও বুঝতে তাদের নানা প্রশ্ন করেছি। যারা ওই ফুলের পসরা নিয়ে ঘোরেন কিম্বা লেকের মাঝে সেই আখরোট কাঠের কাজ করে চলা বৃদ্ধ মানুষ টি, সবাই আমার কাছে চরম বিস্ময়ের, সবার জীবন পড়ার নেশা কাশ্মীর ট্রিপের অন্যতম আকর্ষণ ছিল আমার। রফিক ভাই তাঁর বাড়িও নিয়ে যান আমাদের।আমার শাশুমার মত গোঁড়া মানুষও ওই কদিনে সব ভুলতে শিখলেন। তাঁদের মিষ্টি ব্যবহার তাঁর মনেও নতুন জানলা খুলে দিয়েছিল। আমার জীবন অনুধাবন করতে ভালো লাগে।তাই দিয়ে মামুনির ব্যাপারটা বুঝি। উনি বরিশালের মেয়ে। ওনার পাঁচ ছ বছরের জীবনে দেখা সেইসব স্মৃতি উনি কি ভুলতে পারেন! যাইহোক, রফিকের বাড়ির আপ্যায়ন জীবনে ভুলবো না। রফিকের বউকে কি সুন্দর দেখতে, বাড়িতে অনেক সদস্য। সবাই কি আন্তরিক। আমাদের জফরান চা খাওয়ালেন। সাথে দারুণ সব খাবারের আয়োজন ছিল। রফিকের বাড়ির আপ্যায়ন আমরা জীবনে ভুলবো না। সেদিন ই রফিকের সাথে তাদের শাল তৈরি কারখানা দেখতে যাই। সাথে ওদের যে হোলসেল দোকান সেখান থেকে কেনাকাটা করি। আমার শাশু মা কেনাকাটা পেলে সব ভুলে যান, তাই এই কদিনে তিনিও ওই ভুলতে বসেছিলেন মুসলিম দোকান, যাবো কি যাবো না ইত্যাদি। এরকম অনেক কথা মনে আসে কাশ্মীর বললেই। এক একটা দিন এক এক দিকে বেড়াতে যাওয়া, সর্বত্র এই মানুষগুলিকে ভীষণ মাটির কাছের, ভীষণ প্রাণখোলা মনে হয়েছে। নিজেদের ছোট ছোট চাওয়া পাওয়া দিয়ে বেশ শান্তিতে কাটানো প্রাণ এঁদের। এই যে এত কার্পেট গালিচা বানানো, তার জন্য ছোট ছোট হাত মাকু ধরে যে ধৈর্য নিয়ে তাঁরা এসব করেন এর মূল্য কি আমরা দিতে পারি? ওই যে আখরোট কাঠের কাজ, বুড়ো মানুষটিকে দেখে কি যে বিস্ময় আর ভালো লাগায় ভরেছিলাম কি বলবো। কি অদ্ভুত নিপুণতা দরকার সে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। এই বেড়ানো ঘিরে কত কত জীবিকা তাঁদের। একটা শান্ত মন ওদের। এর সাথেও লুকিয়ে থাকে কত না বলা জীবন কথা। জীবনের লড়াই রোজ লড়ছেন এঁনারা। সীমান্তের যে সব কাহিনী আমরা বুঝি সেসব কথা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা। এসব নিয়েই কাশ্মীর। সেই কাশ্মীর কে নিয়ে এসব যখন শুনি চারদিকের খবরে বা মিডিয়ায় হতাশ লাগে। আমরা দিতে কতটুকু পারি? খালি নেবার জন্য লোলুপ হাত বাড়াই। কশ্মীরের দুদিকের সবুজ ক্ষেতে দৃষ্টি পড়েছে তাদের, ইয়ে হাসিন বাদিয়া ইয়ে খুলা আসমান, সেখানে এবার শিল্প দেখবো,দেখবো কালো কুন্ডলীর ধোঁয়া বেরুচ্ছে বড় বড় পাইপ থেকে, লিডারের জলে পেট্রোল, নোংরা মিশবে, চারদিকে ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে ভরে যাবে। এর ই তো নাম বিজ্ঞান। সভ্যতা। সব বুঝলাম, আশা রাখি তবু বেঁচে থাকবে ওই নিষ্পাপ মুখগুলোর সরলতা। নির্মল হাসি। রিন রিনে কথা। ডাল লেকে আর ঝপ করে সূর্য ওঠা দেখা যাবে না। অনেক উঁচু বিল্ডিং এর ফাঁক দিয়ে উঠতে উঠতে সূর্য এ আর সেই কুসুমাভা পাবো না। বিশ্বায়ন কাশ্মীরের দোরগোড়ায়। কে আটকায় তাকে?

Monday, August 5, 2019

সং ই সার

সং ই সার কি ভাই এই সংসার? এতদিনে কিছুটা হলেও বুঝেছি। বিয়ের পর এটা চার নাম্বার কোয়ার্টারস বদল। মুনিডিতে দুটোতে থেকে ধানবাদের দু আড়াই বছর হাওয়া খেয়ে আবার মুনিডিতে সেকেন্ড ইনিংস এর জন্য যাচ্ছি। এই ক বার বাসা বদলে বুঝেছি সংসার কি? অনেক জামা কাপড়, আরো অনেক বাসন কোসন, আরো অনেক বই খাতা এক হলে একটা জম্পেশ সংসার হয়। তাতে থাকবে দীর্ঘদিনের আবর্জনা, যার সবটাকেই বুকে আঁকড়ে বলতে ইচ্ছে করবে, ও মা এটা? এটা আমার বড্ড দরকারি, ও মা ওটা ফেলছো কেন, ওটা তো ওমুকের দেওয়া প্রথম গিফট, ওহো ওই প্লাস্টিকগুলো দিয়ে তো সব্জি রাখি, আরে ওই কাগজ টুকরো দিয়ে কোলাজ করবো ভাবি, আরে কাঠের টুকরোগুলো ফেলে দিও না, কবে কি গোঁজ মারতে লাগে, আরে পাইপের মুখটা ওখানের নলে ফিট হয়ে যাবে হয়ত, এ বাবা এই বাক্সগুলো ফেলে দিলে? ওই দিয়ে... আমার মত গুছোন্তেদের এরকম কেজো বর টর পেলে জীবনটা কিছু বর্তে যায় বটে, তবে আমি বসে ওই কেউ কাজ করছে দেখতে পারি না। দয়ার শরীর। তাই মটকা দিয়ে ধোঁয়া বেরোয় মাঝে মাঝে। লোকজনের মত আমার ওসব হ্যাংলাপনা নেই যে সারাক্ষণ সিগু টানবো আর চায়ে চুমু খাবো। আমি ক্ষ্যাপা মানুষ। শিফটিং এর দুদিন আগেও তাই ফ্রিজ থেকে চিলি চিকেন বেরোয়। চার পদ রেঁধে রাখতে পারি। মুস্কিল হল ভগবান সবাইকার দমের চাবিটা এক বানান না। আমার দশ পাক দমে এক বেলা গেলে ওর দু দিন চলে যায়। যাইহোক, একটু অন্য কথায় আসি। এই যে বার বার শিফটিং এর কু ফল, সুফল এসব বলি। গতবার প্যাকার্স ডেকে বুঝে গেছি ব্যাপারটা। বড় বস্তা এনে সব ভরে ফেলো আর গায়ে লিখে দাও বেড রুম, ড্রয়িং রুম এসব। তাই এবার নিজেরাই বস্তা এনে সব টুকরো জনিস গোছাতে লাগি আর এক ট্রিপ দু ট্রিপ করে রোজ উনি আপিস যাবার সময় দিয়ে আসেন। প্রথম গেল বই খাতা। তারপর ডিভান দুটো খোলা হল। এই দুবছর ওই জিনিসগুলো বের ই করিনি। তাই বুঝলাম মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই। আগামী পাঁচ কিম্বা পনেরোতেও ওরা ওভাবেই বন্দী থাকবে। সেবারেও ভেবেছিলাম সারিয়ে নেবো। এবারে বুঝলাম ভুল ভেবেছি। তাই পুরানো ওই কেক ওভেন,ছাল ওঠা স্যান্ডউইচ মেকার, কিছু প্লাস্টিকের এটা ওটা এসব এবার বাতিলের লিস্টে। তাও সাহস করে বলি ওটা থাক না, সারিয়ে নেবো, যেন কোনো বুনো নেকড়ে তাড়া করলো, একটা সেই প্লাস্টিকের লেবুর রস করা বাটি। ও বলে , এটা আর কি হবে? আরে এটা আমার ছোটবেলার জানো? এসব হুজুং ভুজুং দিয়ে ওটা রাখা গেল। একটা খেলনার এক দেড় হাত লম্বা বন্দুক প্লাস্টিকের ই। নাহ, ওটা গতবার নিয়ে এলেও এবার আর নিয়ে যাবার কোনো কারণ পেলাম না। কিছু মান্ধাতা আমলের স্যুটকেস,ব্যাগ। উফ, কেন যে ফেলতে এত কষ্ট। নেহাৎ দু একটা উই খেয়েছে তাই বৃষ্টিতে বাইরে ছুঁড়ে দিলাম বাগানের দিকে। মনে হল ওরা চেঁচিয়ে বলছে, শুধু উই খাওয়া বলেই আমাদের এমন কদর! এ আর্তনাদ শুনতে পাই যে আমি। পরের দিন রোদে আধ ভেজা ব্যাগগুলো দেখে আমার সংসারী মন বলে ওঠে ওর পকেটগুলো দেখে নে রে মরা। ও মা, ঠিক এক খান নেক সেট বেরিয়ে এল। নিজেকে নিজে গাল দিলাম, কিল চড় কি আর দেওয়া যায়, এই নেক সেট টার কথা তো ভুলেও গেছি, বুদ্ধের মুন্ডু লাগানো লাল কালো পাথর গার্নেটের, এক নেট বন্ধুর থেকে নিয়েছিলাম। খুব পছন্দের ছিল। একেই হারা নিধি বলে। একটুও মরচে ধরে নি বা কিছু হয়নি। কি যে আনন্দ লাগলো। মেয়ের বকুনি মনে পড়লো, সেও বলে তুমি কিচ্ছু ঠিক করে রাখো না। কি আর করা। সবাই সব পারে না। আমার অগোছালোপনা ঘোচাতে এবার একটা চিপ লাগানো হবে মাথায় শুনছি। এবার আরো বড় কিছু ছেড়ে যাচ্ছি। তার মধ্যে আমার সেই সাধের ট্রেডমিল। বড় শখ ছিল ছিলিম হবো, মানে হবোই হবো। প্রায় দশ বছর বয়স তার, কতটুকু আর বেড়েছি, ওই মেরে কেটে দশ ই হবে। নিন্দুকেরা সেদিন বলেছিল, এটা ওই কাপড় শুকানোর কাজে দেবে। হে হে, নিন্দুকদের টোটা ভরা অভিশাপের গোলা (গুলি নয় কিন্তু) কদিন পর ই কাজে দিয়েছিল। তাও তাকে সেবার এনেছিলাম, কিন্তু ঘরে ঢোকাইনি, গ্যারেজে ছিল এই দু বছর। এ অপমান সে আর নিতে পারেনি। এবার সে গোঁ ধরেছে, ও জামাইবাবু, আমি যাবো না মুনিডিতে। জামাইবাবুর ভারী খেয়ে কাজ পরেছে ওকে নিয়ে যাবে, ছেলেকে বললাম, ছবি তুলে OLX মে ডাল দে, সে তো আরো ল্যাদের পাব্লিক। ভাবলাম নিজেই নিলাম টা হাঁকবো, কিন্তু আর মন করে নি। তবু এই লেখা পড়ে কোনো সহৃদয় পাঠক সেটি উঠিয়ে নিয়ে যেতেই পারেন। ছেড়ে যাবো বাপের রক্ত জল করে কেনা সেই খাটের গদি। নাহ, কোনো যৌতুক ফৌতুক না, বাপ শখ করে কটা ফার্নিচার দিয়েছিল। এসব নিয়ে ইতিহাস লেখার ইচ্ছে আছে। ভাগ্যি দিয়েছিল, তাই মাঝে মাঝেই গর্জাই এটা আমার খাট, বাপের দেওয়া। এই হুঙ্কারেই কত রাতে সেই পাণিপথ, কুরুক্ষেত্র অধরা থেকেছে। তা সেই গদি খানা বহুবার ট্রাই নিয়ে আর পালটানো হয় নি। এবার করেই ছাড়বো পণ। গদিটার আত্মকাহিনী লিখতে গেলে ভালো পানু গপ্প হয়ে যাবে। না মানে আমার খোকাখুকুদের হিসু হাগু বমি সবের টাচ আছে তাতে। দেখো ছোঁয়া আর টাচে বিস্তর ফারাক হয়ে যায় কিন্তু, সেই বিখ্যাত ডায়লগ টা তখনই বিখ্যাত হয়ছিল টাচের ছোঁয়ায়- আপনি কিন্তু আমায় টাচ করবেন না। না মানে যা বলছিলাম আমার সাধের প্রেমের ইতিহাসকে রেখে যাচ্ছি। গুলজার টুলজার তো নই, তাই ওভাবে নিকতে পারি নে কো। আমার সাদা সাপ্টা কথা। এই গদি সেই গদি, সেই যে সেই, সেই প্রথম রাত, দ্বিতীয়, তৃতীয়... সেই যে সিগু খেয়ে ফেলেছিলে, ধিকি ধিকি আগুনে গদিও কিছুটা মুখ পোড়ালো, সেই যে বাচ্চা পার্টি এসে ধামসাতো, সেই যে সবাই কাগজ পেতে এর উপরেই ডিনার করলাম, এ গদি সেই গদি। ভাদ্দর এলে রোদে দিতে দম ছুটতো। যাইহোক সেই গদিতে তেইশ বছরের প্রেমের কাদার থেকেও বেশি লেগেছে কোলিয়ারির ধুলো। তাই কঠিন কর্তৃপক্ষ হতে গেলে এসবকে বাঞ্চাল করতে হয়। তাই গদি তুমি থাকো হেথা, আমি চলে যাই। নাহ, নতুন গদি এসে গেছেন। এতকালের সম্পক্ক মাঝে মাঝে নিজেও হুমকি পাই, এই গদির হাল করে ছাড়বো,সব ই যখন নতুন হচ্ছে... ওদিকে টিভিতে কলের জলের মত তালাক নিয়ে কিসব চলছে কানে এল। পৃথিবীতে এ কদিন কত কি ঘটছে, সব মাথার অনেক উপর দিয়ে হুশ হুশ করে যাচ্ছে। দুনিয়া এখন আমার ওভেন, আমার একোয়াগার্ড, আমার টিউব, আমার ফ্যানে লটকে। গতকাল বাসন তুলতে গিয়ে একদম মিনিমামোস্ব মিনিমাম কিছু রাখলাম। ভাবছিলাম আহা এটুকু দিয়েই যখন চলে তখন কেন যে এত আদেখলাপনা কে জানে। ছেলে এসব সার বুঝেছে। জীবনে খুব স্বল্প রিকয়ারমেন্টে চলে সে। সব থেকে ছোট ব্যাগটা নিয়ে যায়, সব থেকে কম জামা প্যান্ট তার, সবেতে বলে আর কি হবে মা! দু হাত ভরে আশীর্বাদ করি এটাই সার বুঝে থাকিস, আর কি হবে! জীবনটা হয়ত আরো বড় হবে। ও হ্যাঁ, বলা হয় নি, আর কি হবে বলতে গিয়ে কিছু নতুন গেস্টের কথা মনে এল। দুটি এসি নতুন এন্ট্রি নিলেন, এবার দাদাবাবু বললেন একদিন আর একজস্ট না, কুচিনা লাগিয়ে দেবো তোমায়। ব্যাস, বাক্যিবাণ, আমি লুফে নিয়ে গিয়ে অর্ডার দিয়ে এলুম, নতুন যন্ত্রের সাথে মুকালাত হবে। একটা ওয়াশিং মেশিনের জন্য কত প্যানপেনিয়েছিলাম গত শিফটিং এ, বাবুর বড় মন ছিল জানতুম। এবার একটা মিষ্টি ফুটফুটে ওয়াশিং মেশিন এলো। আমার কুড়ি বছরের বুড়িয়ে যাওয়া মেশিনটাও আপাতত থাকছে নিয়ে যাবার লিস্টে। ট্রেডমিল, গদি কিম্বা ওই বন্দুকের মত সেও থেকে যেতে পারতো। কিন্তু কথা হল মালিক পক্ষ সার্ভিস দেখে, বুঝলেন। আপনার রঙ চটে গেছে, কলকব্জা কবে বেরিয়ে কঙ্কাল সার আপনি, ওটো স্টপ ফপ কবেই বিগড়েছে, কিন্তু... এই শুধু কিন্তু গুলোর জন্য আপনি এখনো থাকছেন স্যার। কি কিন্তু? সে ঘোরে, অটো নয় এখন সে নন স্টপ ঘোরে। তার ড্রায়ারে কোনো প্রব্লেম নাই। তাই সে আজো আমাদের। আবার খাদের জীবন, তাই তাতে ওই খাদের জামাকাপড় কাচা হবে। কাচা হবে পাপোশ টাপোশগুলো। সুয়োরানী দুয়োরাণীর গপ্প এখানে আর কি। দেখি কি ক্ষীরের পুতুল গড়ি? শুক্রবার যত তাড়াতাড়ি পারি চলে যাবো নতুন ঠিকানায়, প্যাকার্সরা এসে জিনিস ওঠাতে যতক্ষণ। কেমন কাটলো দুবছর? বুঝলাম বুড়িয়ে গেছি অনেকটা। বোধ বেড়েছে তের গুণ। নতুন করে মিশে মায়া বাড়াতে মন হয় নি আর। তাই তেমন পিছুটান নেই কিছু। শুধু ছেলের হোস্টেলটা খানিক দূর হল এই যা। যখন ছানাপোনা থাকে তখন ঘুপচি ঘর আর এখন হাওদাখানা। গিয়ে আবার সং সেজে সার খুঁজবো আর কি। একটু শেষে আমার লীলার লীলামাহাত্মটা গেয়ে যাই। ধন্য তিনি। তাঁর যে যে লীলা আমি দর্শন করেছি তাই দিয়ে জীবনের অনেক বোধ নিয়ে যাচ্ছি। এভাবেও কাজ করা যায় বলে একটা পাঁচালি নামালে মন্দ হয় না। নাহ, যাবার সময় সুখস্মৃতিগুলোই থাক। এসব আওড়ে আর লাভ নেই। কয়লানগরে সুভাষ মাছ দিতো, স্বপন সব্জি আর সনত আয়রন করতো। এদের ভুলবো না। এরা মানুষ খুব ভালো। শহরের এক রকম কালচার। যেটা তেমন করে নিতে পারলাম না। বাইশ বছর মাটির কাছের মানুষগুলোকে বড্ড চিনেছিলাম। ওদের সারল্য আবার বাঁচাবে আমাদের হয়ত। এখানে সব ফেলো কড়ি মাখো তেল ব্যাপার। ওখানেও হয়ত তাই। কিন্তু আমরা বুঝতে চাই নি সেটা। বার বার মন লাগিয়েছিলাম সবেতে। আজো মুনিডির পেপার আঙ্কেল, দুধ আঙ্কেলরা (ছেলেমেয়ের ডাক) কি খুশি আমাদের দেখে। সেই সরলতার টানেই আবার যাচ্ছি হয়ত। আবার খুঁজবো দোবরু পান্না, ভানুমতীদের আমার আরণ্যকে।।

মেরা কুছ সামান

মেরা কুছ সামান ক্লাস টুয়েলভে মেয়ে স্কুল থেকে একটা কাপড়ের গোলাপ পেয়েছিল। প্রথম কলেজ যেতে বাড়ি ছাড়লো, প্রথম পিছুটান, মা আঁকড়ে রইলো এত সার্টিফিকেট, এটা ওটা, সেটা। ওই গোলাপটা ছিল আমার আলমারির লকারে। গত শিফটিং এ সেটা ঠাঁই পেল অন্য আলমারির ড্রয়ারে। এবার ড্র‍য়ার খালি করেছে তার বাবা। আমি সে সময় অন্যকিছুতে ব্যস্ত, হয়তবা হোয়াটসঅ্যাপেই, বেডরুমে এসে দেখি সেই গোলাপ মাটিতে গড়াচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে ড্রয়ার খুলে দেখি সব খালি। বুঝলাম কেস। আমার হাওড়া বাড়িতে কত কি ফেলে এসেছিলাম। বিশেষ করে বই খাতা, জামা টামা কিছু আর সাধের ওই ইমিটেশন দুল হার। আর সাইকেল খানা। বিয়ে মানেই কত কি। বাবা যে ওই বাড়ি ছেড়েই চলে যাবে অন্য বাড়িতে এসব ভাবিইনি কোনোদিন। পৈতৃক ভিটে, তালা আটকে রয়েছে কত কাল। উই এর আস্তানা। আমার জীবন তখন তুঙ্গে, ছেলে মেয়ে বড় করতে নাকানিচোবানি খাচ্ছি। যখন ফুরসত হল হাওড়া বাড়ি গিয়ে দেখি খাতাপত্র সব উই লাগা, যে জিনিস গুলো যে জায়গায় রেখেছিলাম কিছু নেই। পাগলের মত ছোট বেডসাইড খুলে খুঁজেছিলাম সেই ছোট্ট সবুজ, হলুদ দুল গুলো। মাকে বলতে মা বললো, কে জানে। হঠাৎ একটা মাটির টেরাকোটার বালা পেলাম। ওটার কথা তো মনেও ছিল না,সাথে মনে এলো সেই হাতির দাঁতের চওড়া বালাখানা? নাহ সেটাও পাইনি। বাড়ি বদল খুব বাজে জিনিস। বার বার স্মৃতি লোপাট হয়ে যায়। আর এই কোয়ার্টারস জীবন, ছোট ঘুপচি ঘর হলে তো গেল। মেয়ের গোলাপ টা এবারের দায়ে বেঁচে গেল। সেবার ধানবাদে শিফটের সময় হারিয়েছে মূল্যবান একটা প্যাকেট। ও প্যাকেটে ছিল অনেক কার্ড। মা বাবার বিয়ের, আমাদের, ছেলে মেয়ের ভাতের, ভাইয়ের আরো কত বন্ধু বন্ধবের। খুব ভারী মোটা প্যাকেট। তখন আমার এত ডাস্ট প্রবলেম যে আর খুঁটিয়ে সব দেখতে পারিনি। কত্তা আশ্বাস দিয়েছিল, ফেলিনি ফেলিনি আছে সব। নাহ সেটা নেই আর। সোনার একটা দুল হার গয়না আমায় এভাবে টানে না। কিন্তু বার বার এই ছোট, তেমন কিছু না জিনিসগুলো বুকটা মুচড়ে দেয় হারিয়ে গিয়ে। জীবনের সার বুঝেছি, ওই ছোটবেলাই ভালো। আর সব বাজে। আমার হাওড়া বাড়ি ছাড়ার পর আর কিছুই টানে না আমায়। তবে ছেলেমেয়ের জীবনে এসবের একটু গুরুত্ব রাখতে চেষ্টা করি। খুচরো জিনিস নতুন বাসায় নিয়ে গিয়ে কাল কিছু খুলে খুলে বস্তা খালি করে এলাম। সেবার কিছু এরকম বস্তা আর খুলিইনি, লফটে তুলে রেখেছিলাম। লফটে ছিল উই য়ের বাসা। এত জিনিসে ছোটখাটোগুলো স্মৃতির অতলেই যায়। তাই জানতাম ওই বস্তায় বাসন ভরা। কাল মনে হল ওই বস্তাগুলোই খুলি আগে। তাতে দেখি তিনটে খেলনা গাড়ি উইতে খেয়েছে। তাদের রিমোট অব্ধি রাখা ছিল শক্ত কাগজের খাপে। মনে পরলো সেই ভাইয়ের আনা শক্ত কাটবোর্ডের জিগ জ্যাগ পাজল বক্সের কথা। এরকম দেওয়াল আলমারির মাথায় রাখা ছিল। হঠাৎ একদিন নামাতে গিয়ে দেখি শুধু উপরের খাপ, ভিতর টা পুরো খেয়েছে উইতে। ঝাড়খন্ডের কয়লাখনিতে বাস। ব্যাপারটা বুঝলাম। মনকে বোঝালাম যে জঙ্গল কেটে এই বাসা বাড়ি বানিয়ে থাকা। এখানে উইদের আদি বাস। তাদের সাথে লড়াইটা লড়ে লাভ নেই। প্রতি বছরের সব বাঙলা পত্রিকা নিতাম, পড়তাম। শুরুর দিনে এই বড় খাটের ডিভান ভর্তি থাকতো সানন্দা, দেশে। আস্তে আস্তে জিনিস বেড়েছে, সেসব সরে বালাপোস, কার্পেট, চাদর, বালিশ এসব জুটলো ডিভানে। কেউ কেউ অবাক হত ডিভানে বই শুনে। এদিকে এমন মানুষও আছেন যারা এই বই রাখার কদর বোঝেন না। আমার গায়ে সোনা নেই টা বেশি গুরুত্ব পায়। এখন সব বুঝি। কত রকমের মানুষ। সবাই কি আমার মত ক্ষ্যাপা হবে? কিন্তু সেই সানন্দা, দেশ যা ছিল আমার অবসর, কলকাতার খবর, ফ্যাশন,খাবার দাবারের আপডেট দিত, পুজোবার্ষিকীর গল্প উপন্যাসে দিন কাটাতাম সেসব এক সময় বড় বোঝা হয়ে উঠলো। ছেলে মেয়ের মোটা মোটা বই জায়গা কাড়লো। বুক ভাঙ্গে আমার বার বার। মন শক্ত হয়,চোয়াল আরো বেশি। সব গুছিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জে হারি বার বার। একটা বস্তা থেকে কালো কঙ্কালের মত কি বেরুলো? ছবি তুলে হোয়াটস্যাপ ক্লোজ গ্রুপে দিয়ে বললাম, অরিন্দমের দেওয়া প্রথম গিফট। অরিন্দম নিজে লিখলো,মরা চামচিকা? ইচ্ছে করছিল আবার তুলে রাখি সেটুকুই। সেই ববি সিনেমার সিন, সেই ডান্সিং পুতুল কাচের খাপে মনে পড়ে। এক একটা জিনিসে কত স্মৃতি জড়িয়ে লুকিয়ে। চামচিকেটাকে হোয়াটসঅ্যাপ এডিটে আউট লাইন দিয়ে পোস্টালাম। এসব সময় বার বার এক তুমহারে কান্ধে কা তিল মনে আসে বড্ড। মেয়ের কলেজের এম এ ক্লাসের শুরুতে একবার প্রিয় গানের ব্যাখ্যা আর নিজের জীবন দিয়ে মেলাও সেটা যে কেন প্রিয়,ফোনে এসব আলোচনা চলে আমাদের, আমি বলি শুনেই মেরা কুছ সামান? ও বলে হ্যাঁ, কিন্তু মেলাবো কি করে? কেমন বুঝিয়েছিলাম ওকে,সব সময় কি প্রেমে পরলেই এসব গান কথা হয়? আর লিখতে গেলে সব কি সত্যি লিখতেই হবে নাকি? বানিয়ে ফেল বাকিটা। কিন্তু আমি সেটুকু আশাও রাখি যে বানাতে হবে না,কিছু এরকম অভিজ্ঞতা এ বয়সে হয়েছে নিশ্চয়ই। যাইহোক, কি লিখছি নিজেও জানি না। মাথার কিঞ্চিৎ গোলমাল শুরু হলেও হতে পারে। প্রেমিকের দেওয়া প্রথম গিফট, সেটা মরা চামচিকে ভাবা যায়? ওই টেবিল ল্যাম্প নিয়ে বুক দূর দূর করে বাড়ি ঢোকা।কিনলাম না কুড়িয়ে আনলাম সে ফিরিস্তি দাও বাড়ির পাঁচ ভূতকে। ওই আলো জ্বালিয়ে কত চিঠি নেমেছে রাতে, কিছু না হলেও সুইচ টক টাক করে কত অবসর কেটেছে বিরহের। সে আজ মরা চামচিকে। হাসবো না কাঁদবো। আমার হেল্পার সেই পুরানো লক্ষ্মণ মাঝি বোঝে না কেন ছবি তুলছি।

Thursday, July 18, 2019

গোছগাছ আর আমি

গোছগাছ আর আমি দ্যুতি মুস্তাফি দুনিয়ার অনেক মজাদার কম্বো থাকে, কম্বিনেশন আর কি, আমি আর গোছগাছ ঠিক সেরকম একটা ব্যাপার। অনেকদিন ধরে ভাবছি, এটা নিয়ে একটু ভাটাবো। কিন্তু সেই গুছিয়ে বসার ই সময় হচ্ছিল না। অনেক ভেবে দেখেছি, এই ব্যাপারটা বাড়ির গুণেই হয়। তবে আমাদের বাড়ির অনেক সদস্য ছিলেন তো। তাই কার কোন টা যে আমায় গ্রাস করেছে কে জানে। বাড়ির কর্তা দাদু তো বিশাল ফিটফাট মানুষ ছিলেন। কিন্তু দাদুর কিছুই পাই নি তেমন। দাদুর গোছ কম্পিউটার স্টোরেজ সিস্টেমকেও হার মানাবে। দাদুর খাট, দাদুর স্যুটকেস, আলমারি যে কোন জিনিস এমন কি গামছা, লুঙ্গি, বিড়ি, দেশলাই, চটি, রুমাল সব নিয়ে বড় রচনা নামানোই যায়। আর সে বাড়ির গিন্নি আমার ঠাকুমা এসবের ধার দিয়ে যেতেন না। লোক আসবে বলে আমাদের বাড়িতে সাজো সাজো রব তেমন শুনি নি। কারণ সর্বদাই তো কেউ না কেউ এসেই আছে। এতগুলো মানুষ, কচিকাচার দল সেখানে জায়গার জিনিস জায়গায় হলেই গোল বাঁধতো। কত জোড়া চটি জুতোই থাকতো বাড়িতে। থালা বাসন, বিছানা পত্তর ছেড়েই দিলাম। এই আটপৌরে ব্যাপার দিয়ে আমি যে বিশাল গুছোন্তে হয়ে উঠবো না সে তো মালুম ই হয়। পড়তে পড়তেই বিয়ে করেছি, সে সময়ের বই এর তাক কেমন ছিল কিম্বা টেবিল সেগুলো ভাবি আজ। বই নামলে উঠতো না। উঠলে নামতো না। কাজের থেকে অকাজের জিনিস বেশি থাকতো। বিছানায় ক্যাসেট, পেন, খাতা এসব টইটম্বুর। তবু আমি সে বাড়িতে আলনা গোছাতাম, বড় আলমারির বই এর যাবতীয় দায়িত্ব রাখতাম। আরো অনেক কিছু। বিয়ের সময় খাট বিছানা দিতে গিয়ে আমার কাকা এসে বলে,ও বাড়ি নাকি বিশাল সাজানো। অত বড় বাগান একটাও শুকানো পাতা নেই। তখন এসব কি আর বুঝতাম, ভাই তার আগে গেছিল, এসে বলেছিল, ওদের নাকি সবুজ দেওয়াল, সবুজ বেসিন, সবুজ ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন। কিন্তু সে সবে আমি কিছুই বুঝি নি। এগুলো দিয়ে একটু হলেও আমার গোছানো সত্তা বুঝছেন! বিয়ে হয়ে ও বাড়ি গেলাম। জীবনের সব রহস্য রোমাঞ্চের শুরু। একজন সাঁতার না জানা লোক কে জলে ফেলে দিলেও আমার থেকে ভালো পারফর্ম করবেন। প্রচুর খোরাকি গল্প স্টকে। সব ওগড়াবো কি না খুব কনফিউজড। তাও শুরু করা যাক। ফুলশয্যার রাতের গল্পটাই আগে বলি। সেই ব্রকেড চাদর, ফুল দিয়ে সাজানো। গোলাপের পাপড়ি দিয়ে ভরাট। মাঘ মাসে বেশ ঠান্ডা, তার উপর ই শুয়েছিলাম দুজনে। আহা ফুলশয্যা আর নাহলে বলা কেন বাপু। সকালে উঠে কেলোর ব্যাপারটা বুঝলাম। ফুলের পাপড়িগুলো বেচারা চেপ্টে চাদরে এমন রং আর গন্ধ ধরালো যা জীবনে ভুলবো না। বহুকাল সেই রং অটুট ছিল। সাথে আমার কত্তার পাঞ্জাবিটাতেও যেটা আকবর আলি থেকে বানানো হয়েছিল, এই মহান কীর্তিটি বেশ অনেক কাল এদিক সেদিক সবাই ওই পাঞ্জাবিতে দাগ লেগেছে বলে আহা উহু করে বলতেন। আর আমি ততোই লাল হয়ে উঠতাম। সেই রং নিয়ে রংবাজি শুরু। বিয়ের সময় সব ম্যাচিং ম্যাচিং। সব নতুন। নিজের জামা, সালোয়ার কাচতাম,ধুতাম হয়ত বিয়ের আগে, কিন্তু এই নতুন ব্লাউজ, পেটিকোট এসব? সাথে বরের হাল্কা রং জামা কিম্বা শ্বশুর মশাইয়ের গেঞ্জি এসবকেও রংীন করে ফেলেছি। সেই পর্বটা ওই ছেলে মেয়ের নতুন জামা প্যান্ট কাচার ক্ষেত্রেও হয়েছে। কাচাকুচির মর্ম টর্ম বুঝতে অনেক কাল লেগেছে। বিছানার চাদরের সাথে মোবাইল কিম্বা এসির রিমোট মাঝে মাঝেই মেশিনে ঘুরেছে। প্যান্ট জামার পকেটের জিনিসের কথা নয় ছেড়েই দিলাম। মাঝে মাঝেই পে স্লিপ, দশ কুড়ির নোট কেচে সাফ হয়ে যেত। নোটের পাশে শূন্য তোমরা লাগিও। নোট বা রুমাল অনেক সময়ে ইস্তিরি হয়েও পকেট থেকে বেড়িয়েছে। আর মাঝে মাঝেই দেশলাই কাঠিগুলো ভেসে উঠতো মেসিনে। আমার শাড়ি পরা নিয়েও অনেক গল্প, সব শাড়িই সেই নিবেদিতা স্কুলের লাল পাড় সাদা শাড়ি ভাবতাম। সেই শাড়িতে যেমন কাবাডি খো খো সব হত তেমন বালুচরি, বেনারসি, কাঞ্জিভরমেও ছেলে মেয়ের দই তোলা সাথে হাগু মুতু সব লাগিয়ে ফিরতাম। বরটাও কম বয়েসি ছিল, একবার বলেছিল, কত দামের শাড়ি সেটা সাঁটিয়ে রেখো, নইলে কেউ বুঝবে না তোমার ছিরি দেখে। কোথাও বেড়াতে গিয়ে এক দুটো করে শাড়ি ফেলে টেলেও এসেছি। সাথে থাকতো খোঁচ লেগে ছেঁড়া। এদিকে সংসারের জাঁতা বেশ বনবনিয়ে ঘুরছে, ছেলে মেয়ে হয়ে নাকানি চোবানি জীবন। বিনা গুছিয়েই সংসার চলছে। ড্রেসিংটেবিল এ বোতল, সেরেল্যাক এসব জায়গা পেতে লাগলো। মেয়ে একদিন দেখি সব রকম টিপ গোটা গাল কপালে লাগিয়ে যত লিপ স্টিক আছে ঠোঁট চিবুকে মেখে চোখে আচ্ছা সে কাজল ঘষে সেজে রেডি। সেই শুরু হল সব সরানো। বাইরের ঘরের নীচের দুটো তাকে ওরা হাত পেত বলে মোটামুটি খালি রাখা হত। আজো রাখা হয়নি ড্রেসিংটেবিলের সেসব গুছিয়ে আর। আজ ই দেখি ড্রেসিংটেবিল জুড়ে অনেক গুলো গোল্ড ফ্লেক। আমার হাত ব্যাগের ছোট চেনে কটা টিপের পাতা, দু চারটে লিপ স্টিক, সিঁদুরের স্টিক, আর কিছু দুল থাকে। মেন বড় খাপেএকটা চিরুনি আর সান গ্লাস। একটা ক্রিমের টিউব। ওটাই ড্রেসিংটেবিল আমার। ছেলে মাঝে মাঝেই ওই ক্যাসেটের ফিতে খুলে ঘরে ছড়াতো, একবার উলের গোলা নিয়ে এ ঘর থেকে সে ঘর গোল গোল ঘুরে নিজেই জড়িয়ে যাবার দশা। এসব সামলাতে হিমসিম খেতাম। সব থেকে মজার ব্যাপার, এই নতুন কলোনিতে শিফট হয়ে এসে খুব ছিনতাই এর উপদ্রব। তাই আর সোনা দানা ঘরে নেই। যখন সোনার দুল পরতাম তখন সেসব এদিক সেদিক গড়াতো। আর আজ পাঁচ টাকা জোড়ার তিন জোড়া দুল আমার বড্ড যত্নের। পরে যখন খুলে রাখি যত্ন করে ওই ব্যাগের ছোট খাপে নিজেই হাসি খুব। এক একটা লিখছি আর একগাদা স্মৃতি উপচে আসছে। আমাদের বাইরের ঘরে মোটামুটি সব থাকে। ঘরে ঢুকেই আগে একটা বাঁদিকে সেল্ফ ছিল। এই সেল্ফ নিয়েও গল্প আছে, কোলিয়ারি এলাকার কারপেন্টার, তাকে দিয়ে আমি নতুন গিন্নি কিছু কাঠের জিনিস বানাই। তাতে ওই সেল্ফটাও ছিল। সেও মহান, আমিও মহান। স্বস্তিক চিহ্নটা ঠিক ই করেছে, কিন্তু ওটা টাঙানোর যে হুক সেটা উলটো দিকে করে, সেই থেকে উলটো স্বস্তিক আমার ঘরে। অনেক সুহৃদ কিম্বা শুভাকাঙ্ক্ষী বৌদি দাদারা এসে বলে গেছেন, এটা কিন্তু রাখা ঠিক নয়। কারণ জানতে বলতেন, স্বস্তিক চিহ্ন উলটো এটা বাস্তু, ফেংস্যুই এসবে খুব বাজে বলে। -ও, হ্যাঁ, আচ্ছা এসব বলে দেঁতো হাসি হেসে পার পেতাম। মনে মনে সেই থেকে কোথাও জেদ জমতো। কি হয় উলটো স্বস্তিকে? আজো ওটা আছে তেমন ই। সংসার শুরুতে সেটায় ছোট টেপ রেকর্ড, ওয়াকম্যান, সব চাবি টাবি এসব থাকতো। তারপর ঘড়ি, মোবাইল এসব আরো সব বিল, পে স্লিপ এসবও। মা, বাবারা এলেই বলত, এমন ঘরে ঢুকতেই এসব রাখিস, কেউ নিয়ে যায় যদি! টি টেবিলের তলায় রাখা হত ছেলে মেয়ের খেলনা। ওদের সেই খেলনা সারা মাটি ছড়ানো থাকতো।পাশের কোয়ার্টারের বৌদি এসে বলতেন, তোর বাড়ি এলে আতংক লাগে। সারা মেঝে খেলনা, মুড়ি ছড়ানো, বিছানায় স্কেচ পেন, পেনের কালি, বই পত্তর, দেওয়ালে আঁকিবুঁকি, চ্যবনপ্রাশ এর আল্পনা। মাঝে কলোনিতে অগোছালো বলে বেশ আখ্যাও পেয়েছিলাম। আমি আর আমার কত্তার কিছু মজার ট্রিক ছিল। কেউ আসবে শুধু দশ মিনিট আগে জানাক, আমাদের ঘর গোছানো হয়ে যেত। যথারীতি আমি ওসব পাটে যেতাম না। আমি কি খাওয়াবো দেখতাম আর ও সব গুছিয়ে আমায় বলতো, দেখো তো! আমি একটা ওয়াও মার্কা হাসি দিতাম। হাসি মেলাতে মেলাতেই গেস্ট ফেস্ট এসে হাজির। কেউ অত বুঝতো কি না জানতাম না, তবে নিজেরা কি মজাই না পেতাম। সেই ট্যাঁপা টেঁপির গল্পের মত কেস, সুখ সব, ও আমায় খাটের তলা দেখাতো, দেখলাম সব সেখানে। কিম্বা আর কোনো দেওয়াল আলমারিতে ঠুসে দেওয়া হয়েছে প্লাস্টিকে ভরে। সেসব জিনিসের আর তেমন দরকার পরতো না রোজের জীবনে। কিন্তু যে দিন ওই কোনো জীবন বীমার কাগজ কিম্বা এসির ওয়ারেন্টি পিরিয়ড এর কাগজ খোঁজা হত সেদিন ওসবে চিরুনি তল্লাসি চলতো। খুব কঠিন হত বছর শেষের সপ্তাহটা। ছেলে মেয়ের স্কুলের নানা ঢং, সাথে রোজের রিহার্সাল কিম্বা ক্লাব গেম কিম্বা পিকনিক, সব মিলিয়ে ভিতরের ঘরের খাট জামাকাপড়ে বোঝাই হয়ে যেত। কত্তার আবার স্যুট প্যান্ট সব সেট না বার করে, চারটে জামা পরে না দেখলে হবে না। প্রতিবারেই আক্ষেপ ঝুড়িঝুড়ি। আমাদের সব ঠিক থাকে, ওর কিছু নেই। যেহেতু সারা দিন রাত খনিতে পরে থাকতো, ওর এই বাইরের পরার জামাটামা বিশেষ দেখা হত না আর কি। ওই লিকলিকে শরীরে সব ই যেন কেমন লাগে। তেনার মটকায় ধোঁয়া বেরুলে চুপ থাকাই শ্রেয়। যেন কি হচ্ছে আমি কিছুই জানি না। শেষে কিছু একটাতে থিতু হতেন। ততক্ষণে চারটে সিগারেট দু কাপ চা হয়ে গেছে। এই সব রইলো, বাড়িতে এক আমি ই থাকি। তাই আমার দায় সব ঠিক করা। এই লোড নিতে পারতাম কিন্তু ফট ফট করে ঘর গোছানোটায় আজো খুব অপটু। মনে মনে ভাবি খুব হাই ফাই পোস্টে চলে গেলে, ওই মেন্টেন ফেন্টেন করতে হলে গেছি আর কি। তাই বরের খুব বেশি পদোন্নতি আমার মোটে কাম্য নয়। একটাও বড় অফিসারের বৌ আমার মত ল্যাদেশ্বরী নন। আমি একটিও দেখিনি। যা দিনকাল এসেছে, ছিমছাম, আটপৌরে এসব কথাই আর থাকবে না। এক দাদা আমার বাড়ি এলেই বলেন, তোর বাড়িতে এলে বেশ বাড়ি বাড়ি ফিলিং হয়। অন্যদের বাড়ি গেলে হোটেলে এসেছি মনে হয়। হ্যাঁ, এটাই জীবনের পরম পাওয়া। তবে আমার ফেসবুকীয় এলবাম ইত্যাদি সাজানো দেখে লোকজন এটা মেলাতে পারে না 🤣। আমি আজো এক আছি, হয়ত কিছুটা শিখেছি। সমাজ বড় দায়। সেই সাথে এমন মোটা চেহারা, লোকজন এমনি ই দু য়ে দু য়ে চার করে। এখন বর ও বুঝেছে এ মাল পাল্টাবার নয়, তাই ও অনেক ম্যানেজ দেয়। আমাকে একা ছেড়ে দিলে তাবড় হোস্টেল পিজির ছেলে ছোকড়ারাও হেরে যাবে। গেল ডিসেম্বর এ ছেলের কিছু বন্ধু এসে ছিল কদিন। তারা প্রায় বলেই ফেলছিল, ইয়ে ঘর তো হোস্টেল জায়সা হি হ্যায়। যাক সক্কাল সক্কাল আমি গুছোন্তের গপ্প পড়ে ফেলুন, আজ এক্সট্রা এনার্জি পাবেন ই পাবেন। বিছানা তুলতে গিয়ে এই শর্মাকে স্মরণ করবেন। আজ লেপ টা আর পাট না করে সারাদিন ওমনি ফেলে রাখতে পারেন। বালিশ যেখানে ছিলে সেখানেই থাক না। মশারী? আরে আজ তুলবেন না। সারাদিন এ ঘরে আর কাজ কি বলুন তো? যত সব অলক্ষ্মীর কথা? আপনার লক্ষ্মী আজ হয়ত বেশি শুতে চাইছে এমন করে ভাবুন না। আর আপনিও কাজের ফাঁকে একটু এসে লেপে পা দুটো ঢুকিয়ে বসুন। দেখবেন আমাকে এসে ভালোবাসতে মন করবে। প্রচুর চেনা জানা এসব পড়ে বুঝবে এ আমার দ্বারাই সম্ভব, ওদের বলে বোঝাতে পারি না ল্যাদে কি সুখ! নাহ, চলি। কে এসবের কোর্স করতে চান জানাবেন। অগ্রিম বুকিং চলছে। আপনার শরীর আপনার মন, আপনি ভালো রাখুন। আমায় নিয়ে খিল্লি ওড়ান। আজ চলি।

ব্যালান্স খেলা

ব্যালেন্স খেলা দ্যুতি পৃথিবীটা মাঝে মাঝে কেমন অচেনা লাগে। সেই অচেনা পৃথিবীতে চলতে বেশ অন্যরকম লাগে। একটু হাতড়ে বেড়াই, কিছু সহায় খুঁজি, কিছু খড়কুটোর দাম বেড়ে যায় নিজের কাছে। বড় বড় গাছগুলোকে বেচারা লাগে। প্রহসন করি বেঁচে থাকা নিয়ে। সামনে দিয়ে একটা একটা স্ক্রিনশট ছিটকে যায়, আবার কোনোটা আটকে থাকে পাঁজরের খাঁজে। একটা ছেলে মায়ের হাত ধরে বড় রাস্তা দিয়ে হাঁটছে, মা ছাতা ধরে, ছেলেটা অনেক ছোট, ছাতা দিয়ে তার মাথা আগলানো যায় না, কিন্তু মায়ের মন, তাই ছাতা রোদ্দুর আগলানোর গল্প এক হয়ে যায়। ছেলেটা রাস্তা দিয়ে হাঁটে আপন মনে। পা গুলো এলোমেলো ফেলে। পিচ রাস্তার ধারেই ঢালু লাল রাস্তা। ছেলেটা ওই দুই তলের মধ্যে ব্যালেন্স ব্যালেন্স খেলে। সামনে ছায়ার সাথে ধরাধরি খেলে। দুজনের জগৎ দুই কথা বলে। মা নিরাপত্তা খোঁজে, ছেলে খোঁজে মজা, আনন্দ। ব্যালেন্স করে চলায় মজা পায় ছোট্ট কেজি টুয়ে পড়া ছেলেটা। তার বাবাও কিছুদিন আগে জমির আল ধরে ওরকম ব্যালেন্স ব্যালেন্স খেলতো। তারপর শহরে পড়তে আসা, বিয়ে, ঘর,সংসার কত কি! এই ছেলেটাও বড় হবে, ব্যালেন্স ব্যালেন্স খেলবে সারাজীবন। কিন্তু আর এই আনন্দটা পাবে না। আর মা এমন ছাতা ধরে থাকবে না তার জন্য। মা মানে পুজোর শাড়ি। মা মানে একটা দুটো সেল্ফি, জড়িয়ে চুমু, মা মানে স্কাইপি, হোয়াটসঅ্যাপ কল, মা মানে ফোনের বিল, ইলেক্ট্রিক বিল,কেবল চ্যানেল, ধূপ ধুনো পুজোপাট। হঠাৎ ছাতাটা বড্ড দরকার লাগে, রোদ টা বড্ড কড়া লাগে, বুকের সেই পাঁজরের খাঁজে গুঁজে রাখা স্ক্রিনশট জীবন্ত হয়। বলে, ' খোকা, এসেছিস?' খোকা ছাতা খোঁজে, আজও খোকা সেই ধার দিয়ে হাঁটে, ধার গুলো আজ আরো এবড়োখেবড়ো, আরো বড় ব্যালেন্স খেলা খেলে খোকা। আজ সে সেই ছাতাটা খোঁজে, ছাতার আড়ালে চোখের জল বাষ্প হয়। খোকার মা আজ ব্যালেন্স খেলে। লগবগ ডগবগ! খোকার মা ব্যালেন্স খেলে। লগবগ ডগবগ!

পুরনো কলকাতার গপ্প

পুরানো কলকাতা

আমিও লিখতে চলে এলাম। সব্বাই কত কি লিখছেন রোজ, পড়তে ভালো লাগে বেশ। না, আমি এই গ্রুপে লিখি না, আমি তো কলকেতের মেয়ে নই কো। আমি হাওড়ায় বড় হয়েছি, তাই এই গুরুপে মাকে এডিয়ে রেখেছিলাম। মা কলকেতের মেয়ে, খোদ বাগবাজারের। সেই সময় মাল্টিপারাসে পড়েছেন, মাসিরা নিবেদিতা ইস্কুলে পড়া। দাদুর শিয়ালদহতে সেই যুগে হোটেল লজ ছিল, যেটা আজও ব্রীজের উপর দিয়ে 'শান্তি লজ ' বলে দেখা যায়।  ছোট থেকে ওদিক দিয়ে গেলে কেমন অনুভব হত, দাদুর করা লজ, শান্তি আমার বড় মাসির নাম। সে যাইহোক, হাওড়ার হয়েও কলকাতার সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গেছি বৈ কি। আমার  মামার বাড়ির গল্প দিয়ে শুরু করি।

৩০, নবীন সরকার লেন, ছোট থেকে সবাই দুটো বাড়ি খুব চেনে, নিজের আর মামার। কেন যে মামাবাড়ি বলি কে জানে বাপু, বাড়ি তো আসলে দাদুর, তার বাবার,  তার বাবার। তবে আমার দাদু আমি হবার পরেই গত হন তাই আমার ক্ষেত্রে ওটা মামাবাড়িই বটে। ওই গলিটায় সবাই মামা আমার। গলিটায় ঢুকলেই অন্য পরিবেশ যেটা আমার হাওড়া বাড়িতে নেই, গলির দুদিকেই সব বড় দোতলা বাড়ি। তাই রোদ কম ঢোকে সেখানে,  তাই কেমন শান্ত শান্ত। আর গলিতে কোনো দোকান নেই, তাই ওই সারাদিনের হৈ চৈ নেই। তবে মাল্টিপারপাস স্কুলের ঘন্টা শোনা যেত নিঝুম দুপুরে। মামাবাড়ি লোকে খুব আসে কিন্তু আমার তেমন কিছু ছিল না ছোটতে, কারণ আমার মামারা অনেক বড়, তখন বিয়ে করে নি, দিদা বুড়ি মানুষ, আর হাওড়া কলকাতা দূরত্ব কম তাই মা থাকতো না তেমন, দিনের শেষে চলে যেত। তবু কত স্মৃতি জড়িয়ে গেছে সেখানে। দোতলা বাড়িটার ঢোকার মুখে মস্ত দরজা, খুব শক্তপোক্ত।  এমন দরজা আমার হাওড়া বাড়িতে নেই। ওই দরজা দিয়ে ঢুকেই দুদিকে দুটো দরজা। দুটোই মোটামুটি সেন্ট, ধুপ এসবের জন্য দেওয়া থাকতো। ধ্রুব মামার লোকজন ওসব করতো এই জানতাম। আমরা গেলেই দাঁড়াতাম, জুতো খুলতাম,  আর ওই মামারা একটা করে ছোট সেন্ট ধরাতেন। আর কি সুগন্ধি ওই চলন পথ জুড়ে। ঢুকেই একটা তিনকোণা বাঁধানো ছোট্ট চৌবাচ্চা টাইপ, ওটায় তখন কয়লা ভরা থাকতো। তার গা বেয়ে এক বড় পাইপ নেমেছে উপর থেকে, যেটা শেষ হয়েছে একটা ঝাঁঝড়িতে। ছাদের বৃষ্টির জল ওটা দিয়ে নামতো বা উপরের বারান্দার জল। ওখান দিয়ে ডান দিকে গেলে আরো একটা ঘর ছিল তারপর উপরে যাবার সিঁড়ি। সিঁড়ি পেরিয়ে ওদিকে বাথরুম,  তারপর একটু উঁচু দালান মত, দালান পেরিয়ে রান্নাঘর।  আর বামদিক জোড়া দেওয়াল এক তলার সমান, আর দোতলায় বড় টিন দেওয়া সেই দেওয়ালের পার্টিশান। ওদিকে শম্ভুমামার বাড়ি, শম্ভুমামা মায়ের কাকার ছেলে। নীচে তেমন কেউ থাকতো না। দুটো ঘরে তো ওইসব আর আরেকটা ঘর মাঝে সাঝে ভাড়া দেওয়া হত, বা একটা বিছানা দিয়ে রাখা থাকতো বা বন্ধই থাকতো। নীচের এই ঘরটার জানলাটা বেশ লোভনীয় ছিল আমার কাছে। পরের দিকে তো আমি ওই বাড়িতে অনেক গেছি, থেকেছি, ওই জানলার মাদকতা নিয়ে বলবো না হয়। এখন সোজা রান্নাঘর আর ওই দালানে যাই বরং। দালানের ডান দিক জোড়া আলমারি। জালের দরজা দেওয়া। দিদার সম্পত্তি সব, পানের ডাবা, সেই বড় পিতল, কাঁসার ডাবর, সাজি, লোহার মোটা জাঁতি এসব। দিদা পানের থেকে দোক্তাপাতা বেশি খেত।  ওই আলমারিতে ছিল কিছু বড় বড় চিনেমাটির জার বা বয়াম, কিছু সাদা, কিছু আধা খয়েরি আধা ঘিয়ে। কোনোটায় আচার, কোনোটায় তেঁতুল, কোনোটায় নুন রাখা। আজ নিজের রান্নাঘর দেখতে গিয়ে বুঝি সেইসব জারের কি মাহাত্ম্য আর ইতিহাস লেগে ছিল তাতে। রান্নাঘর যেতে হলে একটা বড় চৌকাঠ ডিঙোতে হবে। আর চৌকাঠের এই কোণে একটা কাঠের টুল রাখা থাকতো। ওই টুলের আরেক জুড়ি ভাই উপরেও ছিল। টুলগুলোর শেপ, রূপ সব অন্য রকম। মাঝখানে লম্বাটে কাটা, আর বসার জায়গাটা ওভাল শেপের। বেশ পোক্ত। তার পাশে একটা শ্বেত পাথরের টেবিল ছিল। টুল টা বসে গল্প করার জন্য। ওই টুলে বসে যে কত লোক কত গপ্প করে গেছেন আমার দিদার সাথে। তাই এই টুলের কথা না লিখে পারি কি করে!  চৌকাঠ ডিঙোলে দিদার রাজত্ব, সাম্রাজ্য। রান্নাঘরে আবার দুটো ভাগ। একভাগ বামদিকে,  সেটার লাগোয়া লম্বা এক হাত উঁচু বাধানো ঢিবি টাইপ লম্বা আলের মত গেছে। যেখানে বসে দেদার আড্ডা হত। যেটার বাম দিকে আবার আলমারি কাঠের, কাঠের বড় ট্রাংক কালো রং এর, তাতে আবার ড্রয়ার দেওয়া, সেই ড্রয়ারের হাতল বেশ মজবুত পিতলের কারুকাজ করা।  সেসবের ভিতর এত্তো এত্তো কাঁসার বাসন। সাবেকি জিনিস গুলো কবে কি করে যে মিলিয়ে গেল কে জানে। আজ খুব বুঝি ব্যাপারগুলো।  তাই স্মৃতি সবকিছু ছুঁতে চাইছে। ওই লম্বা আল টাইপ ঢিপির শেষে দেওয়াল লাগোয়া ছিল আর্চ করা একটা বাঁধানো দু হাত উঁচু জায়গা। ওই আর্চের খাঁজে ছিল নুন, চিনি,চা পাতা, মসলার জায়গা। আর উপরে রান্না রাখা হত।রান্নাঘরে ওই বড় হাতপাখা এক দুটো থাকবেই। হাত পাখা মানেই উলটো বাঁট পিঠে ঘষা। আজো দেখি দিদা সাদা ইঞ্চি পেড়ে থান পরে ওই রান্নাঘরেই বসে দুপুর পোহায়। ওখানেই হাত পাখা সঙ্গী তার। সামনে উনুনের আঁচ, গ্যাসের নব ঘোরানো পাব্লিক আমরা,  কি আর বুঝবো পাখার আরেক কাজের গুরুত্ব। ওই পাখার হাওয়াতেই সে কখনো গনগনে কখনো টিমটিমে দুপুরের অবকাশে। এই সবেতেই একটা পুরানো ব্যাপার লেগে। এই দেওয়ালের রং হলুদ চুন ওঠা ওঠা, উপরে কড়ি বরগা, ধোঁয়া কালি মেশানো কালো কালো ছিট ছিট, একটু আরশোলা, বড় এক হাত সাইজ পিলে চমকানো মাকড়সা সব আজ স্মৃতি, পিছুটান তবু কত আপন।

দিদাকে সবাই ডিমডিম ডাকতাম। দিদাও কিন্তু হাওড়ার মেয়ে। দিদার ইতিকথা এখন তেমন বলবো না, সেসব আবার হবে, তবে দিদার হাতের রান্না না হলে যে এই রান্নাঘরের গপ্প পুরো হবে না। দিদার রং,রূপ, স্বভাব এসবকিছু না বলে শুধুই রান্নার হাতের গুণেই ইনি সেরার সেরা হতে পারেন। কি শান্ত, কি মিঠে কথা, নরম গলার স্বর শেষদিন অবধি। ওই রান্নাঘর আগলিয়ে বসে থাকা জীবন এগুলো আজকের ওঠাবসা দিয়ে খুব বুঝি। এরপর ওই বাথরুমের গল্প না করলে মামার বাড়ির এক তলার গল্প আধা থাকে যে। বাথরুমটা বেশ অনেকটা নীচুতে। একটা উঁচু ধাপ নামলে বাথরুম।  সিঁড়ির নিচের দিকটাই বাথরুমের ছাদ। ডান হাতে বড় চৌবাচ্চা। এই চৌবাচ্চা মামাবাড়ি আসার অন্যতম আকর্ষণ। টালা ট্যাঙ্কের জল আসতো টাইমে টাইমে তাই নাম টাইম কলের জল। আমার মাকড়সা  ভীতি তাই আমি এলে ওসব তাড়িয়ে পরিস্কার করে রাখা হত। ওই চৌবাচ্চায় কত চান করেছি। উপর দিকে তাকাতাম না ভয়ে, যদি কারোর সাথে মুলাকাত হয়ে যায় এ আনন্দ মাটি। নাক দিয়ে জল গড়ানো না অবধি, 'ওরে নীতা দ্যাখ এদের চান আর হয় না' করে না চেঁচানো অব্ধি সে চান শেষ হত না। তারপরে সেই হাল্কা ফুল পাখি আঁকা টেপ জামা পরে, চুলের জলে পিঠ ভিজিয়ে রান্নাঘরে বসে দিদার পরিবেশনায় খেতে বসা। এসবের সাথেই আরেকটা স্মৃতি বলে ফেলি। মামাবাড়ি মানেই কিছু হট ফেবারিট খাবার থাকেই। আমার জন্য, শুধু আমার জন্য আনা হত গুলে মাছ।আমি সেগুলোকে নড়াচড়া মাছ বলতাম। মামার সাথে হাত দুলিয়ে ব্যাগ ঝুলিয়ে ওইসব বাজার গেছি কত। আর না গেলেও বড়বেলাতেও মামা আমি এলেই ডাক দিতো, ' দেখে যা তোর নড়াচড়া মাছ'।  বড় তাজা আজো সেসব স্মৃতি।



নীচে রান্নাঘর এর সোজা ছিল বড় জানলা। আর ডান দিকে কল। সেই জল যাতে এদিকে না আসে তাই সিমেন্ট দিয়ে ঘেরা। কবেকার প্ল্যান, আরকিটেক্ট, কত মিস্ত্রির হাত, কবেকার চুন বালি সিমেন্টের গল্প। ওই প্রায় মাটি অব্ধি জানলাটা ছিল দিদার বাইরের জগৎ।  সেখান দিয়ে উঁকি মারতো রোদ্দুর, রাতের চাঁদের আলো। আর উঁকি দিয়ে যেত পাড়ার এ ও সে। এই গলির সবটাই নাকি আমাদের দাদুর ছিল। সেসব শুনলে গল্পকথা মনে হয়। বলবো পারলে এক এক করে। সেই সময়ের আরেক স্মৃতি হরিণঘাটার দুধ। কাচের শিশি করে এই দুধ আসতো। শিশিগুলো আবার ফেরত দেওয়া হত। সেই টুংটাং শিশির শব্দ আজো কানে। এবার দোতলায় যাওয়া যাক।

এই বাড়ির সিঁড়ি খুব মজবুত সেটা আজ বুঝি। ধার দিয়ে রেলিং। খাঁজ করা কাজ। সিঁড়ির বাঁকে একটা ছোট লফট টাইপ খালি জায়গা ছিল। এটা ওই ফালতু জিনিসে ভরা থাকতো। আমি ভাই আরো কুচো জুটলে লুকোচুরি খেলার সময় ওই খানে গিয়ে লোকাতাম। দোতলায় একটা সিঁড়ির রেলিং খোলা ছিল। ভাই ছোটতে সেটা দিয়ে গলে সোজা উপরে এসে যেত। রেলিং বেয়ে নামাওঠাও চলেছে কত। আর মাঝে শুরু হয়েছিল লাফানো। উপর থেকে মাঝ সিঁড়িতে লাফ। কি সব  ভয়ংকর কাজ। মা নাকি ওভাবেই ওঠানামা করতো। তাই মা বারণ করে  নি কোনোদিন।  সিঁড়ি পেরিয়ে রেলিং ঘেরা বারান্দা একদিকে আর আরেকদিকে ঘরগুলো। সিঁড়ি দিয়ে ডান দিকে একটা ধাপ উঠে দাদুর ঘর। আমি হবার পর পর ই দাদু চলে যান। তাই ছোটতে বুঝতাম এই একজন নেই। ডিমডিম সদ্য গয়নাগাটি খুলেছেন। আমি জন্ম পাকা। তাই ডিমডিমার কাছে কত গল্প শুনেছি। নাকের নোলক কি হয়, সেই ফুটো দেখা এসব কাজ ছিল আমার। কাউকে তেমন নোলক পরতে দেখিনি। তখন তো এমন টিভি খুললেই রাসমনি চলতো না। দাদুর ঘরের ডান হাতে ছিল একটা সিন্দুক। সবুজ রং এর। তারপাশে কালো বড় আলমারি। একটা বড় খাট ডান দিকে। ওদিকে দরজা দিয়ে বেরুলে বারান্দা রাস্তার দিকের। এ বাড়ির জানলাগুলো ওই খড়খড়ি লাগানো। ছোটতে প্রায় সব বাচ্চা সেই খড়খড়ি তুলতো আর নামাতো। সরু গলি, তাই জানলা খুললেই আরো মুখ, গল্প চলতো। দাদুর ঘরে চারটে জানলা এ দেওয়াল ও দেওয়াল করে।  এখানে হারমোনিয়াম রাখা থাকতো। আসবো আবার ও ঘরে সেসব কথা নিয়ে। ওদিকটা ঘুরে আসি। সিঁড়ির বামদিকে সোজা গেলে মাঝের ঘর আর তারপরে ওদিকে রাস্তার ধারের ঘর। এই দুটো ঘর মার্বেল বসানো। মঝেরটায় কালো সাদা আর ধারের ঘরে সবুজ সাদা। এসব মার্বেলের ইতিহাস, কে কোথা থেকে এনে কবে করেছে এসব মাসিরা এখনো বলেন। আমি ওতো বুঝি না। শুধু স্পর্শ বুঝি। ওই মেঝেতে শোওয়া, বসা, আড্ডা, খেলা, গান কত কি। ঘরে সব আসবাব পুরানো। মাঝের ঘরে শো পিস রাখা আলমারি, যার নীচে ছিল পাল্লা দেওয়া দুটো তাক আর উপরে কাঁচ দেওয়া। সব চীনেমাটির খেলনা, পুতুল, হাঁস, হাতি, ঘোড়া এসব। আজকাল ফেইংশুই শুনি, কিন্তু এইসব পুতুল সে সময় থেকেই ছিল। তখনো নীচের পাল্লা খুললে মলাট দেওয়া মাল্টিপারপাস স্কুলের নীতা বন্দ্যোপাধ্যায় লেখা খাতা বেরুতো। মলাট খুললে হাল্কা গোলাপি রং।  মা কি ঠিক করেছে, কি ভুল করেছে, কিসে কত পেয়েছে, তার খালি পাতায় আমার নাম,  আমার অংক করে ফেলেছি। বুঝিনি এগুলো স্মৃতি হয়ে যায়, হারিয়ে যায়,  কিছু থাকে না। মাঝের ঘরে তিনটে দরজা। দুদিকের বারান্দা যাবার আর আরেকটা ওই ধারের দিকের ঘরে যাবার।  রাস্তার দিকের বারান্দায় ছোটতে যেতে দিত না আমাদের। রেলিং টেলিং পলকা এসব আর কি। ওই বারান্দায় ছিল উপরের বাথরুম।  একটু বড় হতে উপরের বাথরুম ই বেশি প্রিয় হয়ে ওঠে। এই ঘরের ওই রাস্তার বারান্দার দরজা আবার দু দুটো ছিল। বাইরে দিয়ে লোহার গ্রিলওলা গেট আর কাঠের দরজা ভিতর দিয়ে।  এই দরজার ডান দিকে একটা ইয়াব্বড় ড্রেসিং টেবিল। তাতে ছোটতে উঠেও বসতাম। কি দারুণ আয়না, কত নকশা এদিক সেদিকে, ড্র‍য়ার কত কি। এর এক জুড়িভাই আমার হাওড়া বাড়িতেও আছে। তারমানে সে সময় এই টাইপ ফার্নিচারের চল ছিল এটা বুঝতাম। কত সুন্দরীর রূপের কথা এইসব টেবিল জুড়ে, কত কৃষ্ণকলি তার প্রতিবিম্ব দেখে না জানি বেড়ে উঠতো সে সময়।  কেলোটা আমার সাথেও হয়েছিল। আমার মা ক্লাস সিক্সে এক ছবি তুলেছিলেন সেই টেবিলে বসিয়ে সরস্বতী পুজোর দিন। সেই ছবি লিখে দিল আমার সব ইহকাল পরকালের গল্প। দেবো দেবো সে ছবিও দেবো নাহয়।  এই টেবিলের পাশ দিয়ে আবার দরজা ও ঘরে যাবার।  ওই ঘরে তিনটে জানলা। তিনটে দিয়েই রাস্তা দেখা যায়। খাটে শুয়ে কড়ি বড়্গার সাথে জীবনের হিসেব কষা আর ওই জানলা দিয়ে তামাম দুনিয়ার খোঁজ খবর চলতো। এই ঘরে একটু বেশি মা মা গন্ধ ছিল মনে হয়। এই ঘরে একটা দেওয়াল আলমারি আর একটা বড় আলমারি ছিল। মায়ের ছিল বেড়ালের সংসার।  মা এখনো বেড়াল নিয়ে নস্টালজিয়া কুড়ায়। আর আমি এত শুনেছি সেই বেড়ালের কথা যে ওই ঘরে ঢুকেই মনে হত বেড়ালগুলো এই বুঝি এখান সেখান থেকে বেরোবে। মা ও বাড়ি চলে যাবার পরেই কোন বেড়ালের কি হয়েছিল এসব গল্প বলে বলেই মা খাওয়াতো আমায়।  এই ঘরের আরেক দরজা দিয়ে আবার বারান্দায় আসা যেত। তার বাম দিকেই একটা এমনি খোলা তাকের আলমারি ছিল। সেখানে একদিকে কুঁজো একদিকে কলসী  রাখা থাকতো। খড়ের বেড়ির উপর রাখা মাটির পাত্রের সেই জলের স্বাদ ই আলাদা। সেখানে একটা বড় তামার গ্লাস, তামা পিতলের জগ, এক সময় বড় শ্বেত পাথরের গ্লাস ও রোজের ব্যবহার হতে দেখেছি। শ্বেত পাথরের চাকা দেওয়া নকশা কাটা একটা টেবিল ছিল। মাঝের ঘরে ছিল ওই কাচের আলমারির পিছনে আরেক সিন্দুক। এসব সিন্দুকের কত কায়দা। সিন্দুক খুলেই জিনিস তাও না, দেওয়ালের সাইডের দিকে আবার গোপন খাঁজ কাটা, এসব সত্যিই আজ অতীত। সিন্দুকে কি ছিল সেসব আর বলার অবকাশ আছে কি? তাও মা বলে শুনেছি, আমি এটা দেখিনি শুনেছি। মামার বিয়ে একটু বয়েস কালে হয়। সে সময় সেইসব সিন্দুক বাসন কোসন চাক্ষুষ করি। তাও আমি খুব ই ছোট।  সে হবে বিরাশি সালের গল্প। এবার আমার আরেক প্রিয় জায়গায় যাওয়া যাক।

হ্যাঁ, এবার ছাদে যাই চলুন। ছাদ বললেই সেই বামির কথা মনে হয়,  সেই 'হারিয়ে গেছি আমি'।  এরকম ছাদ হয় বুঝি, এত বড়, এত জোড়া জোড়া ছাদ এদিক সেদিক। ছাদের সিঁড়িও ওই নীচের মতোই। ছাদের দরজা দিয়ে বেরোতেই  বামদিকে ঠাকুরঘর। আমার দেখা অন্যতম সুন্দর ঠাকুরঘর। মার্বেল পাথরের তিনটে সিঁড়ি,  কাচে ঘেরা ভিতরের দিকের দেওয়াল,  আর ছোট ছোট জানলা। কি হাওয়া খেলে সেখানে। এখানে এসে গেলে আলাদা জগৎ।  কেউ টের পাবে না কি করছি, কোথায় আছি। সকাল সন্ধ্যে নারায়ণ সেবা ইত্যাদি চলতো অবিরাম। সবকিছু খুব কাছ থেকে দেখেছি বুঝেছি আর উপভোগ করেছি। এই ঠাকুরঘরের মেঝেতে আমার বই  খাতা আমি আমার ফাঁকিবাজি কত কি ছিল। ঠাকুরঘরের বাইরে অনন্ত কলকাতার আকাশ। এই আকাশ আমার মাকে চেনে জানে। ছোটবেলা থেকেই মামাবাড়ি মানে আরেক আকর্ষণ ছিলো বিশ্বকর্মা পুজো। আমার দিদার হাতের সেই নানারকম রান্না, ফি বছর  এক স্বাদ, এসবের সাথে ছিল ঘুড়ি ওড়ানোর গল্প। ও পাড়ার সেই সময়ের লোকজন সবাই জানতো  ঘুড়ি আর নীতা নামটা কি প্রচন্ডভাবে জুড়ে। মা আমাদের খুব ছোটতেও প্যাঁচ লড়ে ঘুড়ি নামিয়েছে, মায়ের লাটাই ধরে হাঁ হয়ে দেখতাম আকাশে, চারদিকের ছাদ থেকে নীতা নীতা আওয়াজ।  সেই মা লক্ষ্মীমতি বৌমাটি হাওড়া বাড়ির, তাও দেখেছি ঘোমটার খুঁট দাঁতে চেপে ভাসুর দেওড়দের সাথে ঘুড়ি উড়িয়েছে।  মা কি জানতো নারীবাদ, প্রগতিশীল এসব?

যাইহোক, মামাবাড়ি মানেই হাজার স্মৃতি এরকম। আমাদের উঠতি বয়সে মাইমা আসে, সে আরেক জীবন। মাইমা খুব ভালো বন্ধু হয়ে রইলো। মামা মাসি এদের নিয়ে লিখলে আবার মহাকাব্য হবে, তাও আমি জানি খুব কম। আজ এই বাড়িটা ভেঙে ফ্ল্যাট উঠছে, আর চারদিকে এত লেখা পড়ে আমার স্মৃতি চাগাড় দিলো বৈ কি। পরবর্তীকালে আমার স্কুল বাগবাজারে হয়, হাওড়া থেকে নিবেদিতা স্কুলে ঠ্যাঙাতাম। তাও খুব দরকার ছাড়া মামাবাড়ি থাকিনি। থাকার হার বাড়লো মাধ্যমিকের সময়  থেকে। আমাদের সীট পরে মাল্টিপারপাসে, তখন ওই সময় মামাবাড়ি থাকতে লাগি। মামা আমার জন্য ওই রাস্তার ধারের উপরের ঘরে ব্যবস্থা করে দেয়।  আমার কি লাগবে না লাগবে, সাথে আমার বন্ধু, তাদের মা বাবা কে ওই বাড়ি যেত না তার ঠিক নেই। আমার দিদা শেষ বয়সে অনেকদিন বছর শয্যাশায়ী ছিলেন। অনেক শোক পেয়েছেন জীবনে। কিন্তু কি তাঁর ব্যবহার,  কি তাঁর কথা, শিক্ষা এগুলো খুব দেখে শেখা। শরীরের শক্তি কি করে একটু একটু করে বের হয় সেসব বুঝেছি দিদাকে দেখে। আমি হায়ারসেকেন্ডারি দেবার পরে রেজাল্টের সময় দিদা মারা যায়।  মামার ছেলেমেয়েরা সব এক এক করে বড় হয়। ছোটমামা দিদার সামনেই মারা যান। আর আমার বেঁটেমামাও অকালে মাইমা, ছেলে মেয়েদের রেখে চলে যায়।  আমি সেবার পুজোতেও মামাবাড়ি গেছি। মামা নীচের ঘরে আমার ছেলের সাথে দাবা খেলেন। আমার ছেলে তখন বেশ ছোট, বছর পাঁচ- ছ হবে, তার চোখের সামনে অত বড় দাবার বোর্ড ঘুঁটি সে প্রথম দেখে।  মামাদাদুর সাথে খেলে কি খুশি। সেবার ডিসেম্বরে মামা চলে যায়।  আমি তারপর বহুকাল ও বাড়ি যাই নি। খুব কষ্ট হত ভাবলে যে মামা নেই। তারপর  আবার একটু আধটু যেতাম। সবকিছু খাঁ খাঁ করতো, ওই রান্নাঘরে তালা পরে,  এদিকে অন্য ঘরে রান্না শুরু হয়। অনেক বদল হয়েছে বাড়ির। তবু জানতাম আছে বাড়িটা। কিন্তু এবার আর নেই।  মোটামুটি ভেঙে গেছে। দ্রুত কাজ হোক এটাই চাইবো। মামার পরিবার গত দু বছর পাড়ার এদিক সেদিক ভাড়ায় আছে। যেখানে ওই গলির সব বাড়ি তাঁদের ছিল। এসব হিসেব মেলানোর আমি কেউ নই। আমি শুধু স্মৃতি ওগড়াই।

মামাবাড়ি আর যে কথা এখনো বলা হয়নি একটুও তা হল,  গান বাজনা। এ বাড়ির ইঁট কাঠ কড়ি বরগাও সুর জানতো মনে হয়। আমার মেজমাসি তখনকার দিনে বেতার শিল্পী ছিলেন, আমি বড় হতেও ৮২-৮৩ তে মাঝে মাঝে মেজমাসির গান শুনেছি রেডিওতে। আমাদের সবাই মেজমাসির কাছে গানের নাড়া বেঁধেছি। সেই মাসিরও এখন দিদার মত হাল।  বিছানা সঙ্গী কিন্তু এখনো সুর খেলা করে কন্ঠে। মেজমাসির জীবন নিয়ে অন্যদিন বলবো। ছোটমাসি মানে মায়ের ছোড়দি, তিনিও এককালে দারুণ গাইতেন নজরুলগীতি, ভজন। তাঁর ও এখন একঘরে দিন রাত কাটে কিন্তু এঁনাদের গান ই জীবন। আজো কি সুর, কি মায়া মাখানো গলা। আমার মাকে তো সব থেকে কাছ থেকে দেখলাম।  আজো সত্তরে নতুন গান তোলে, গায়, সব গানের কথা সুর নখদর্পনে।  আমার ছোটমামা খুব ভালো  তবলা বাজাতেন। সাথে মান্না দে,  রফি সাহেবের গান দারুণ গাইতেন। আর গাইতেন শ্যামাসংগীত,  ঠাকুরের গান। এঁদের দেখেছি গাইতে গাইতে কাঁদতে। এসব কথা কত বললে  থামা যায় জানা নেই আমার।  আমি শুধু একজনের কথা বেশি করে বলার জন্য জায়গা রাখছি সে হল মেজমামা বা বেঁটেমামা।  এই মামার কি গুণ আর কি দোষ আমি বুঝিনি।বড্ড ছোট ছিলাম। কিন্তু এই মামার সাথেই বেশি থেকেছি। বেশি বুঝতে চাইতাম কিন্তু  কিছুই বোঝা হয়নি তাঁকে।  তবু এই মামার হারমোনিয়াম বাজানো দেখতাম আমি। কি মারাত্মক রকম ভালো কি বলবো। আর গলার  সুর, এই মামা আমায় রসদ জুগিয়েছে বড় হবার। ওই দাদুর ঘরে মামার সাথে ঘন্টা কাটাতাম গান শুনে। মামার ওই ঘরে কত ক্যাসেট, মাধ্যমিক দিয়েছি সদ্য,আমি ওই ক্যসেট এনে জোটালাম আমার হাওড়া বাড়িতে। মামার গলায় মানবেন্দ্র, শ্যামলের গান যেন আরো দারুণ লাগতো। আমি নিজে গাইতে পারি না তেমন আর কিন্তু এই শোনার নেশা আমায় অনেক বড় করে তোলে। সে সময় অনুপ জালোটা উঠেছে, বেঁটেমামা কোথা থেকে ক্যাসেট আনে, কতবার সেই মাইয়া মরি, এয়সি লাগি লাগন শুনতে লাগি। গানের কথা আমায় গভীরে নিয়ে যেতে লাগে সেই বয়সে। মামা রোজ রাতে ক্যারাম খেলতে যেত। ওই ক্যারাম খেলা, ওই বোর্ডের উপর আলো এসব আমায় খুব টানতো। আমিও প্রচুর ক্যারাম পিটি এক কালে। মামার মত মন আজো পাই নি তেমন।  কিছু কারুর লাগবে শুনলে সেই মুহূর্তে তাকে সেটা না দিয়ে ছাড়তো না। মামার প্রচুর বন্ধু প্রচুর গল্প।  আরেকটু শুধু বলি, মামার অফিসের অনুষ্ঠানে যেতাম,  সেখানে দেখেছি মামার অভিনয় দক্ষতা। নাটকে কি অভিনয়।  কিছু বোঝা হয়নি। বড্ড ছোট ছিলাম। আর বড় হয়ে  বুঝতে লাগলাম তুমি চলে গেলে। আপাতত মামাবাড়ি পর্ব এখানেই ইতি।

বাকি চলবে কলকাতার আরো কথা।


কলকাতা মানে মামাবাড়ি ছাড়া যে বাড়ি মনে আসে সদানন্দ রোডের ওই তপন থিয়েটারের পাশের বাড়িটি। ওখানে নীচের তলাটা পুরো মেজমাসি ভাড়ায় ছিলেন। ভাড়া বাড়ি কি এসব তখন জানতাম না। এই বাড়িতে আমি জন্মের কিছু পরে আসি। মায়ের কাছে এই মেজদিই মায়ের মত। দাদু আমার জন্মের পরে চলে যান, তাই বাড়ির ছোট মেয়েটিকে কে আনবে বাপের বাড়ি?  কে দেবে একটু আরাম। মাকে আমার মাসি নিয়ে গেছিল। এসব গল্প এত শুনেছি যে আমি যেন দেখতে পাই সব,মাসির কোলে ঢুকলাম সেই সদানন্দ রোডের বাড়িতে। মাসির জীবন নিয়ে এবার বলি খানিক। আমি যেটুকু জানি দেখেছি তাই বলবো। মাসিকে দাদু সেই যুগে গানের তালিম দিয়েছেন,  দাদু নিজেও খুব গান পাগল মানুষ ছিলেন। আর বাগবাজার মানেই রামকৃষ্ণ অনুরাগী, দাদুও তাই ছিলেন। মেজমাসি সেই সময় এখান সেখান অনুষ্ঠানে ডাক পেতেন, নিবেদিতা স্কুলের গুড বুকে চিরকাল নাম। মাসির কাছে শুনেছি সে সময় বাগবাজার স্ট্রীট ছিল ধূ ধূ, চারদিকে মাঠ, সেসব পেরিয়ে স্কুল যেতে হত। মেজমাসির আরেক পরিচয় হল, রামমোহন  কলেজের লাইব্রেরিয়ান ছিলেন তিনি। আমি যে মাসিকে চিনি তিনি ওই সদানন্দ রোডের বাড়িতে রান্না গুছিয়ে মিট সেফে রেখে কলেজ যেতেন। আবার এসে রান্নাঘরে।  হাঁ গাল একটু বড়, হাসলে গালের এদিক থেকে ওদিক ভরে যায়,  কখন যে এদের চান হত,কখন যে রান্না, কখন যে গান আর কখন সবার সেবা, খোঁজ তার ইয়াত্তা পেতে আমায় অনেক বড় হতে হয়েছে। সাজগোজ সেই আঁটপৌড়ে, সুতির শাড়ি কিম্বা সিল্ক, লম্বা বেনী দিয়ে হাত খোপা, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, আর পায়ে চটি জোড়া। কপালে বিন্দু ঘাম। কিন্তু মুখে সেই হাসি, 'ও মা,  তুই এসেছিস, বোস' বলে আমায় বলতে হোত না কিন্তু আমার কি লাগবে সব জুটে যেত। ভাড়া বাড়ি কি জানতাম না। এখন তো বুঝি। ঢোকার দুটো দরজা, সোজাটা উপরে বাড়িওয়ালাদের আর বাঁদিকের তিন ধাপ সিঁড়ি উঠলে রেলিং ঘেরা বারান্দা, তার মাঝে দরজা, কলিং বেল বাজলে খুলে যাবে,  ঢুকেই একটা বড় ঘর। একটু রোদ কম আসে তাই বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা এই ঘর। এ বাড়ির জানলায় জাল লাগানো। ঘরে নানা সময় নানা বদল দেখেছি। মেসোমশাইরা অনেক ভাই, তাদের কেউ না কেউ এ ঘরে থেকেছেন, কখনো এ ঘরে গানের আসর বসেছে, কখন শিল্পী জামাইয়ের আঁকার ঘর এরকম নানা রূপ দেখেছি সেটার। এই ঘর পেরিয়ে লম্বা ঘর,  তার বামদিকে তিনটে ঘর, আর সেই ঘরের বাকিটা ডাইনিং,  আর ও প্রান্তে রান্নাঘর, সেটাও বেশ বড়। রান্নাঘরের শেষে ওদিকে কলতলা। আরো আগে কলতলার ওপাশে রান্না হত যতদূর মনে আসে, ওদিকে উনুন ধরানো হত। এখানে একটা বাইরের দিকে চৌবাচ্চা  ছিল, তাতে মাছ থাকতো। এই বাড়িটায় রোদ আলো কম আসতো আজ সেটা বুঝছি। তাই দিনের বেলাও আলো জ্বালাতে হত। বেশ বড় বড় সব ঘরগুলোই। মেজমাসির এমন জীবন, কত যে মানুষ তাঁর এই ভাড়া বাড়িতেই এসে বাচ্চা বড় করেছেন, কেউ স্কুল, কেউ কলেজ,কেউ নতুন চাকরি, কেউ বিয়ে করে নতুন সংসার,  কেউ চোখ অপারেশন, কেউ শরীর সারাতে এরকম কত দায় কত দরকার সেরেছেন। মাসির বাড়ি গেলে নিত্য নতুন মুখ দেখাটা তাই অভ্যাস ছিল। আর যেহেতু লাইব্রেরিয়ান, বই রাজত্ব ছিল তাঁর।  এত কথা কোনটা আগে কোনটা পরে বলি বুঝছি না। তাই এক স্মৃতির ঘাড়ে আরেক স্মৃতি জমা হচ্ছে, একে ঠেলে ও,  ওকে ঠেলে সে এসে জুটছে। মাসী মেসো দুজনেই বাতের ব্যাথায় ভুগেছেন খুব কম বয়স থেকেই। মেসোমশাইয়ের শুনতাম হাঁটুর মালাইচাকি অপারেশন ছিল, রূপোর বাটি বসানো। এসব ছেলেবেলার সেই মনে কেমন কেমন সব স্মৃতি।  তাই মেসো লাঠি নিয়ে বেরুতেন, পা মুড়তে পারতেন না, সব সময় লম্বা করে রেখে বসতেন। ছোট থেকেই এ বোধ গড়ে উঠেছিল, যে এদিকে মেসোমশাই বসবেন তাই খাটের ওদিকে গিয়ে বসি। উনি টেলিফোনে চাকরি করতেন। চিরকাল ধুতি পাঞ্জাবিতেই তাঁকে দেখেছি। রোগা-সোগা লম্বা মানুষ। মা বাবার দীনেশ দা হোন তিনি, আসলে দীনেশ রায়। টেলিফোনে চাকরি করতেন, তাই দাদুর খুব প্রিয় মানুষ ছিলেন। মাসি মেসো আমাদের হাওড়া বাড়িতে মাঝে মধ্যেই আসতেন। ঠাকুমা,  দাদুর খুব কাছের মানুষ ছিলেন এঁনারা। আর মাসিকে পাওয়া মানেই গান শোনা। মাসি মানেই বই। ঠাকুমাও খুব বই ভালোবাসতেন। তাই নানা বই এ বাড়িতেও চলে আসে। আমি তখন ওয়ান টু এ পড়ি।মা বাবা আমার গানের শেখার তোরজোড় করে।  প্রতি রবিবার নিয়ে যেত মাসির বাড়ি। হাওড়া থেকে কালীঘাট। আমাদের বাড়ির সোজা রাস্তা ছিল জি টি রোড, সেটা পেরিয়ে সোজা গেলে গঙ্গা। রামকৃষ্ণপুর ঘাট, লঞ্চ পেরোলেই ওদিকে বাবুঘাট। বাবুঘাট মানেই কলকাতা। নদীর ওপারে সব সভ্যতা, এপার মানে সব অন্ধকার।এসব গল্পও হবে নাহয়। যাইহোক,  ওপারে গিয়ে ৪৭ বি বাস ধরতাম যতদূর মনে আসে। মা বাবা আমি,  এ সুখ রাখি কোথায়!  সেই লাল নীল ফ্রক, সেই মোজা জুতো, পরিপাটি আমিটি, আমার মিষ্টি গলাটিকে সঁপে দিতে চেয়েছিল মা মাসির কাছে। এক অক্ষয় তৃতীয়ায় পুজোপাট করে ওই সদানন্দ রোডের বাইরের ঘর পেরিয়ে বাঁ হাতের ঘরে আমার গানের হাতে খড়ি। প্রথম গান 'তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী',  তারপর 'দেখো দেখো দেখো শুকতারা'। আমি খুব ছোট প্রাণী তখন। নিজের বিচার বুদ্ধি তেমন পাখা মেলেনি। মাসি যেমন গাইতেন তেমন শিখতাম। বেশ ছিল দিনগুলি। রবিবার মানে মাসির কত এক্সট্রা কাজ, ঘরের কাজ, বাইরের কত মানুষ দেখা করতে আসতেন সেসবের মাঝেও আমার সাধনা চলতো। গানের পরে মায়েদের আড্ডা, মাংস ভাত খাওয়া, রাতে লুচি আলুর সাদা তরকারি এসব উপরি ছিলোই। বাড়ির ওই বারান্দাটা অদ্ভুত লাগতো। দাঁড়ালে কোথা দিয়ে সময় কেটে যেত। হুশ হুশ করে শুধু গাড়ি যেত। ফুটপাথ দুদিকে,  ধারে কিছু ছেড়ে ছেড়ে গাছ লাগানো। সারাদিন লোক চলাচল। পাশে তপন থিয়েটার,  আমার বড় হওয়া পুরোটাই মনে হয় সেই 'নহবত' চলেছে, তার প্ল্যাকার দেখে বড় হয়েছি। তাই সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়,  রত্না ঘোষালের নাম,মুখগুলো আজো ভুলিনি। মাঝে মাঝেই লাইন দেখতাম। সদানন্দ রোড বাস স্ট্যান্ডে নেমে রাস্তার ফুট ধরে সোজা গিয়ে ডান দিকের রাস্তায় খানিক গেলে এ বাড়ি। রাস্তা দিয়ে আসতে আসতে মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি,  ফলের দোকান থেকে ফল এসব নিয়ে আমরা আসতাম। ওই ডানে ঘুরলে হাত ছেড়ে দেওয়া হত। আমি বড় হবার স্বাদ পেতাম। কিন্তু তপন থিয়েটারের ওই লাইন আমায় দাঁড় করিয়ে দিত। বাবা মা এলে আবার হাত ধরে ফেলতাম। এ সুখ, এ স্মৃতি বড় আপনার, বড় নিজের।
  তখন ডাল্ডার যুগ শেষ,  বাজারে এটা সেটা রিফাইন ওয়েল এলো।  এই বাড়ি এলে পোস্টম্যান তেলের সাদা ধবধবে ফুল্কো লুচি পেতাম।আমার আর ভাইয়ের বড় ভালোলাগার সেসব। এই বাড়িতে আরো কিছু আকর্ষণ জন্মায় আমার। মেজমাসির খাটের সোজা আলমারি, তাতে চাবির রিং ঝোলানো থাকতো। সেই রিং এ ক টা ছোট পুতির মত বল আর ওই তিন চার ধাপ গোল গোল করা,  কোনোটার উপরে একটু ফাঁক, কোনোটার নীচের দিকে,  এভাবে ভিতরের খাঁজে পৌঁছাতে হবে। আমি বসে যেতাম সেই চাবির রিং নিয়ে। আমার ঘন্টা কাটতো তাতে। হয়ে গেলেই দৌড়ে মাসিকে দেখানো।  মাসি আমি গেলেই কতকাল সেই রিং ধরিয়েছে আমায়। এই ঘরের লাগোয়া আরেকটি অপেক্ষাকৃত ছোট ঘর। ওটা বেশ পড়ুয়াদের ঘর টাইপ। একটা অন্য জগৎ, এ বাড়ির তুলনায়।  এ বাড়িতেই আমার মাসির মেয়ে চন্দ্রা দি আর ছেলে বুকুদা বড় হয়েছে। চন্দ্রাদির তখন টেন, ইলেভেন, টুয়েলভ, কি সুন্দর রোগা রোগা দেখতে, চোখ মুখ সবকিছুতে একটা অন্য টান...খুব ভালো নাচ করে ছোট থেকেই। ছোট থেকে কিছু কথা কানে লেগে থাকে, চন্দ্রাদির সম্বন্ধে শুনতাম, ওর নাচের ফিগার, নাচের হাত পা, আঙুলের গড়ন। ওই ছোটতে কি যে ছাই বুঝতাম। চন্দ্রাদির জুড়ি ছোট মাসির মেয়ে শুভা দি, এদের দুজনের দেখতাম হলায় গলায় ভাব। আজ আমার মেয়েকে যখন ছোট মেয়েগুলো নকল করে, ওর সাজ স্টাইল দেখে অনুকরণ করতে যায় তখন বুঝি যে আমিও একদিন এই দুই দিদিকেই আমার আইকন ভেবে বড় হয়েছি। চন্দ্রা দি নাচ আর শুভা দি মানেই গান এই জানতাম ছোটতে। চন্দ্রাদির এই লম্বা চুল, ওর গতিবিধি ওই ছোটতে বুঝিনি অত, হঠাৎ বুঝি ওর বিয়ে। এ বাড়িতে অনেক লোক আসে আগেই বলেছি,  তাদেরই এক চেনা মানুষকে দেখলাম বর সেজে আসতে, আমি সেই বিয়েতে দিদির লেজুড় মানে নিত কনে। দিদির বর শিবু দা, দিদি সবে হায়ারসেকেন্ডারি আর তাতেই বিয়ে,  শিবু দা আর্টিস্ট, ভালো ছবি আঁকে। আমার দেখা প্রথম বিয়ে সেটা, আর এই বাড়ি থেকে। সেই প্রথম উপরে গেছিলাম। উপরেও এরকম মাসি মেসোর মতোই একজোড়া মানুষ,  সেখানেও এরকম এক জোড়া দাদা দিদি ছিলেন বুঝলাম। এছাড়াও বিজয়া ইত্যাদি সারতেও গেছি মাঝে সাঝে। আমি অত মানুষের ভিড় এই প্রথম দেখলাম। কত হাসি কত হৈ চৈ, তখনো বিয়েবাড়ি ভাড়ার হিড়িক ওঠেনি। আমাদের কাছে এসব সাবেকিয়ানাই বটে আজকের দিনে। মেজমাসির এত বড় পরিবার, তাই কত মানুষ,  চন্দ্রাদি, বুকুদাদের খুড়তুতো, জ্যাঠতুতো কত ভাই বোন দাদা দিদি, কিছু বৌদি, জামাই আরো কত কি সম্পর্ক। সামনে থেকে দেখতে লাগি কে কেমন সাজছে, কে কেমন কথা বলছে, হাত পা নাড়ছে সব। আর সবাই প্রায় আমার গাল টিপে, ' নীতা মাসির মেয়েটা কি মিষ্টি গো!' আমিও মইতে চড়ে থাকি। আমার গল্পে শোনা রাজপুত্তুর এসে রাজকন্যাকে নিয়ে চলে গেল সেই বাস্তব রূপ পেল। কানাঘুষো গেলা ছোট থেকেই কাজ ছিল, এ বিয়েতে বাসি বিয়ে আছে, কারণ এরা বাঙাল এসব ঢুকছে আমার রন্ধ্রে। রাতের সবকিছু তখনো ক্লিয়ার হয়নি, আবার সকাল হতে না হতে কি সব শুরু হয়ে গেছে।  আমার ভূমিকা সেদিন কেউ টের পায়নি যারা সেদিন ছিলো আর আজ এই লেখা পড়ছে। শুধু চোখ দিয়ে দেখেছি আর নিজের মত মালা গাঁথবো বলে যত্ন করে রেখেছি এসব স্মৃতি।  শিবুদা ব্যাপারটা কি? এরকম একটা লোক কাল অব্ধি আসতো আড্ডা দিতে আর আজ বিয়ে করে নিলো দিদিকে, এটা কি সহ্য হয়! কিন্তু লোকটা যে আমার সাথে ভাব জমিয়ে ফেলেছিল আগেভাগেই।  আমার টুকটুকি নামটাকে টিকটিকি করে আমায় ওর ছোট গিন্নিও ডাকতো মাঝেসাঝে।  এই গিন্নি টিন্নির মানে আমি জানতুম। আমার হাওড়া বাড়ির দাদুর আমি পাটরানি, আদরের গিন্নি কত কি ছিলাম, আমার জন্য দাদু তার দুয়োরানিকে তালাক দিত। যাইহোক,  সেই শুরু থেকেই শিবু দা আমায় দেখলেই বলে পাকাচুল বেছে দিবি,মোটেও তখন পাকাচুল ছিলো না তার। সবাই এসে বলতো,' কি ভালো জামাই হয়েছে, কি সুন্দর দেখতে, জোড়া ভুরু, চন্দ্রার সাথে খুব মানিয়েছে' - আমার কেস হিস্ট্রিতে সেসব জমা পরেছিল। সকালের সেই সিঁদুর পরানো, বাসি বিয়েতে কত আনন্দ আর সন্ধ্যের দিকে দিদি চলে যাবে শিবুদার সাথে সে এক কি স্যাডসিন। সবাই কাঁদছে। দিদিও কাঁদছে। আমার কম্পুটার সার্চ করে চলেছে ব্যাপারটা কি, এই তো এত আনন্দ, কাঁদে কেন সবাই। তার সাথে মনে আছে লোডশেডিং হয় সে সময়।  খুব ছোটবেলার স্মৃতি, আসলে সেটা লোডশেডিং নয়,  কিছু করে ফিউজ উড়ে গেছিল। মা ওই একবাড়ি লোকের মাঝে ফিউজ সারায়। তাও এসব বেশ মনে আছে। যাইহোক,  শেষে দিদি চলেই গেল। সবাই বাইরের ঘর থেকে যে যার মত আবার কাজে লাগে, সবাই আছে দিদি নেই, চলে গেল শ্বশুরবাড়ি। আমরা নাকি কাল ই যাবো এই আনন্দে আমি রইলাম। দিদির বিয়ের পরে ও বাড়ি এলে বুঝলাম এ বাড়িতে আরেকজন থাকে। একে বাড়িতে খুব কম দেখি। থাকলেও ওই ভিতরের ছোট ঘরে। ঘর প্রায়ই দোর দেওয়া। ওইটাই সেই পড়ুয়া পড়ুয়া ঘর। এটা বুকুদার ঘর। একটা ছোট খাট, ছোট আলমারি কাঠের, তাতে ব্রুস লি, ওদের ভাইবোনের সাদা কালো ছবি এসব সাঁটানো,  আরেকদিকে পড়ার টেবিল, বই এসব। দাদার বেশ হাই পাওয়ার চশমা। বাড়ির মেয়েরা এক রকম আর ছেলেরা এক রকম করে থাকে, এ আমার ছেলেমেয়ে দিয়ে আমরা ভাইবোন দিয়ে খুব বুঝি। মেয়েদের কাজ এই তামাম দুনিয়ার খবরে আর ছেলেরা একটা নিজের জগৎ তৈরি করে নেয়। রোজের ওই ডাল্ডা না ফ্লোরা এসব খবর তাদের অত জানার দরকার হয় না। যাইহোক, এই দাদার কাছে কিছু মজার খেলার বাক্স ছিল। ছিল গিটার,  সরোদ এরকম এটা সেটা বাজনার জিনিস, ছিল ব্যাট বল, ওখানেই টেবিল টেনিস র‍্যাকেট, হকি স্টিক, বিলিয়ার্ড বোর্ড কি হয়, নানা দেশের কয়েন, স্ট্যাম্প , হরেক ম্যাগাজিন এসবের হদিশ পেতাম আমি আর ভাই। দিদির বিয়েতে ভাই সবে হয়েছে, এবার আস্তে আস্তে তার সাথে জীবন শুরু আমার। বুকুদাকে দেখেছি বেশ বেলায় ঘুম থেকে উঠতে, যেটা সেসময়  প্রায় বিরল চিত্র ছিল। বুকুদা ইংলিশে খুব ভালো,  হঠাত হঠাৎ শুনতাম এই চাকরি পেয়েছে কিম্বা এটা ছেড়ে ওটায় গেল। তারপর একবার শুনি ভূটান গেছে। একটু বড় হতে নিজে আসা যাওয়া করতাম, খোঁজ নিয়ে যেতাম, ছুটিছাটায় এসেও থেকেছি কত মা ছাড়াও। ওই ছোট ঘরে থেকেছি, পড়েছি কত। আমার দু চারটে বই খাতা সব জায়গা ঘুরতো। মেসোমশাই ভালো অঙ্ক করাতেন, ছোটতে আমি অনেক সময়ই মেসোমশাইয়ের কাছে বসতাম অঙ্ক নিয়ে।  আস্তে আস্তে মাসির কলেজে গেছি কত বার। সেই আমার আরেক জগৎ দর্শন। বই সমুদ্র, বই পাহাড়। মা বসিয়ে দিয়ে শাড়ির দোকান হ্যানাত্যানা করে আসতো। আমি মাসির সব বন্ধুদের চিনতাম। তাঁদের মধ্যে ভারতী মাসি ছিলেন হাওড়ার আমাদের বাড়ির কাছের মানুষ। এই যে অনেকের সাথে আলাপ, মিশে যাওয়া,  এ আমায় বরাবরই তৃপ্ত করে।  মেজমাসির হাত ধরে বিক্রম বেতাল, হরিশচন্দ্র-শৈব্যা,পঞ্চতন্ত্র পড়া, কি সুন্দর ছবি দেওয়া দেওয়া সব বই। ক্লাসে উঠলেই বই পেতাম। মাধ্যমিক দিয়ে একটা দারুণ জীববিজ্ঞানের বাংলায় অভিধান উপহার পাই। এ বই আমার পরম সম্পদ ছিল। বায়োলজি বেজায় ভালো লাগতো। তাই এই বইয়ের হাত ধরে অনেককিছু  জানা পাওয়া হয়েছিল।তখন ডাল্ডার যুগ শেষ,  বাজারে এটা সেটা রিফাইন ওয়েল এলো।  এই বাড়ি এলে ফ্লোরার তেলের সাদা ধবধবে ফুল্কো লুচি পেতাম।আমার আর ভাইয়ের বড় ভালোলাগার সেসব। এই বাড়িতে আরো কিছু আকর্ষণ জন্মায় আমার। মেজমাসির খাটের সোজা আলমারি, তাতে চাবির রিং ঝোলানো থাকতো। সেই রিং এ ক টা ছোট পুতির মত বল আর ওই তিন চার ধাপ গোল গোল করা,  কোনোটার উপরে একটু ফাঁক, কোনোটার নীচের দিকে,  এভাবে ভিতরের খাঁজে পৌঁছাতে হবে। আমি বসে যেতাম সেই চাবির রিং নিয়ে। আমার ঘন্টা কাটতো তাতে। হয়ে গেলেই দৌড়ে মাসিকে দেখানো।  মাসি আমি গেলেই কতকাল সেই রিং ধরিয়েছে আমায়। এই ঘরের লাগোয়া আরেকটি অপেক্ষাকৃত ছোট ঘর। ওটা বেশ পড়ুয়াদের ঘর টাইপ। একটা অন্য জগৎ, এ বাড়ির তুলনায়।  এ বাড়িতেই আমার মাসির মেয়ে চন্দ্রা দি আর বুকুদা বড় হয়েছে। চন্দ্রাদির তখন টেন, ইলেভেন, টুয়েলভ, কি সুন্দর রোগা রোগা দেখতে, চোখ মুখ সবকিছুতে একটা অন্য টান...খুব ভালো নাচ করে ছোট থেকেই। ছোট থেকে কিছু কথা কানে লেগে থাকে, চন্দ্রাদির সম্বন্ধে শুনতাম, ওর নাচের ফিগার, নাচের হাত পা, আঙুলের গড়ন। ওই ছোটতে কি যে ছাই বুঝতাম। চন্দ্রাদির জুড়ি ছোট মাসির মেয়ে শুভা দি, এদের দুজনের দেখতাম হলায় গলায় ভাব। আজ আমার মেয়েকে যখন ছোট মেয়েগুলো নকল করে, ওর সাজ স্টাইল দেখে অনুকরণ করতে যায় তখন বুঝি যে আমিও একদিন এই দুই দিদিকেই আমার আইকন ভেবে বড় হয়েছি। চন্দ্রা দি নাচ আর শুভা দি মানেই গান এই জানতাম ছোটতে। চন্দ্রাদির এই লম্বা চুল, ওর গতিবিধি ওই ছোটতে বুঝিনি অত, হঠাৎ বুঝি ওর বিয়ে। এ বাড়িতে অনেক লোক আসে আগেই বলেছি,  তাদেরই এক চেনা মানুষকে দেখলাম বর সেজে আসতে, আমি সেই বিয়েতে দিদির লেজুড় মানে নিত কনে। দিদির বর শিবু দা, দিদি সবে হায়ারসেকেন্ডারি আর তাতেই বিয়ে,  শিবু দা আর্টিস্ট, ভালো ছবি আঁকে। আমার দেখা প্রথম বিয়ে সেটা, আর এই বাড়ি থেকে। সেই প্রথম উপরে গেছিলাম। উপরেও এরকম মাসি মেসোর মতোই একজোড়া মানুষ,  সেখানেও এরকম এক জোড়া দাদা দিদি ছিলেন বুঝলাম। আমি অত মানুষের ভিড় এই প্রথম দেখলাম। কত হাসি কত হৈ চৈ, তখনো বিয়েবাড়ি ভাড়ার হিড়িক ওঠেনি। আমাদের কাছে এসব সাবেকিয়ানাই বটে আজকের দিনে। মেজমাসির এত বড় পরিবার, তাই কত মানুষ,  চন্দ্রাদি, বুকুদাদের খুড়তুতো, জ্যাঠতুতো কত ভাই বোন দাদা দিদি, কিছু বৌদি, জামাই আরো কত কি সম্পর্ক। সামনে থেকে দেখতে লাগি কে কেমন সাজছে, কে কেমন কথা বলছে, হাত পা নাড়ছে সব। আর সবাই প্রায় আমার গাল টিপে, ' নীতা মাসির মেয়েটা কি মিষ্টি গো!' আমিও মইতে চড়ে থাকি। আমার গল্পে শোনা রাজপুত্তুর এসে রাজকন্যাকে নিয়ে চলে গেল সেই বাস্তব রূপ পেল। কানাঘুষো গেলা ছোট থেকেই কাজ ছিল, এ বিয়েতে বাসি বিয়ে আছে, কারণ এরা বাঙাল এসব ঢুকছে আমার রন্ধ্রে। রাতের সবকিছু তখনো ক্লিয়ার হয়নি, আবার সকাল হতে না হতে কি সব শুরু হয়ে গেছে।  আমার ভূমিকা সেদিন কেউ টের পায়নি যারা সেদিন ছিলো আর আজ এই লেখা পড়ছে। শুধু চোখ দিয়ে দেখেছি আর নিজের মত মালা গাঁথবো বলে যত্ন করে রেখেছি এসব স্মৃতি।  শিবুদা ব্যাপারটা কি? এরকম একটা লোক কাল অব্ধি আসতো আড্ডা দিতে আর আজ বিয়ে করে নিলো দিদিকে, এটা কি সহ্য হয়! কিন্তু লোকটা যে আমার সাথে ভাব জমিয়ে ফেলেছিল আগেভাগেই।  আমার টুকটুকি নামটাকে টিকটিকি করে আমায় ওর ছোট গিন্নিও ডাকতো মাঝেসাঝে।  এই গিন্নি টিন্নির মানে আমি জানতুম। আমার হাওড়া বাড়ির দাদুর আমি পাটরানি, আদরের গিন্নি কত কি ছিলাম, আমার জন্য দাদু তার দুয়োরানিকে তালাক দিত। যাইহোক,  সেই শুরু থেকেই শিবু দা আমায় দেখলেই বলে পাকাচুল বেছে দিবি,মোটেও তখন পাকাচুল ছিলো না তার। সবাই এসে বলতো,' কি ভালো জামাই হয়েছে, কি সুন্দর দেখতে, জোড়া ভুরু, চন্দ্রার সাথে খুব মানিয়েছে' - আমার কেস হিস্ট্রিতে সেসব জমা পরেছিল। সকালের সেই সিঁদুর পরানো, বাসি বিয়েতে কত আনন্দ আর সন্ধ্যের দিকে দিদি চলে যাবে শিবুদার সাথে সে এক কি স্যাডসিন। সবাই কাঁদছে। দিদিও কাঁদছে। আমার কম্পুটার সার্চ করে চলেছে ব্যাপারটা কি, এই তো এত আনন্দ, কাঁদে কেন সবাই। তার সাথে মনে আছে লোডশেডিং হয় সে সময়।  খুব ছোটবেলার স্মৃতি,  তাও এসব বেশ মনে আছে। যাইহোক,  শেষে দিদি চলেই গেল। সবাই বাইরের ঘর থেকে যে যার মত আবার কাজে লাগে, সবাই আছে দিদি নেই, চলে গেল শ্বশুরবাড়ি। আমরা নাকি কাল ই যাবো এই আনন্দে আমি রইলাম। দিদির বিয়ের পরে ও বাড়ি এলে বুঝলাম এ বাড়িতে আরেকজন থাকে। একে বাড়িতে খুব কম দেখি। থাকলেও ওই ভিতরের ছোট ঘরে। ঘর প্রায়ই দোর দেওয়া। ওইটাই সেই পড়ুয়া পড়ুয়া ঘর। এটা বুকুদার ঘর। একটা ছোট খাট, ছোট আলমারি কাঠের, তাতে ব্রুস লি, ওদের ভাইবোনের সাদা কালো ছবি এসব সাঁটানো,  আরেকদিকে পড়ার টেবিল, বই এসব। দাদার বেশ হাই পাওয়ার চশমা। বাড়ির মেয়েরা এক রকম আর ছেলেরা এক রকম করে থাকে, এ আমার ছেলেমেয়ে দিয়ে আমরা ভাইবোন দিয়ে খুব বুঝি। মেয়েদের কাজ এই তামাম দুনিয়ার খবরে আর ছেলেরা একটা নিজের জগৎ তৈরি করে নেয়। রোজের ওই ডাল্ডা না ফ্লোরা এসব খবর তাদের অত জানার দরকার হয় না। যাইহোক, এই দাদার কাছে কিছু মজার খেলার বাক্স ছিল। ছিল গিটার,  সরোদ এরকম এটা সেটা বাজনার জিনিস, ছিল ব্যাট বল, ওখানেই টেবিল টেনিস র‍্যাকেট, হকি স্টিক, বিলিয়ার্ড বোর্ড কি হয়, নানা দেশের কয়েন, স্ট্যাম্প , হরেক ম্যাগাজিন এসবের হদিশ পেতাম আমি আর ভাই। দিদির বিয়েতে ভাই সবে হয়েছে, এবার আস্তে আস্তে তার সাথে জীবন শুরু আমার। বুকুদাকে দেখেছি বেশ বেলায় ঘুম থেকে উঠতে, যেটা সেসময়  প্রায় বিরল চিত্র ছিল। বুকুদা ইংলিশে খুব ভালো,  হঠাত হঠাৎ শুনতাম এই চাকরি পেয়েছে কিম্বা এটা ছেড়ে ওটায় গেল। তারপর একবার শুনি ভূটান গেছে। একটু বড় হতে নিজে আসা যাওয়া করতাম, খোঁজ নিয়ে যেতাম, ছুটিছাটায় এসেও থেকেছি কত মা ছাড়াও। ওই ছোট ঘরে থেকেছি, পড়েছি কত। সেসময়ের বাড়ি মানেই ঘুলঘুলি আর কুলুঙ্গি কমন। কুলুঙ্গি মানেই গণেশ লক্ষ্মী মূর্তি কিম্বা চাবির রিং, ইলেক্ট্রিক বিল,  ছোট তালা চাবি এসব। আর এই ঘরের সাথে আরেকটা বিশেষ ভালো লাগা ছিলো ওই ঘুলঘুলি।  ঘুলঘুলি দিয়ে জালি জালি রোদ ঘুরে বেড়াতো ঘর জুড়ে। খাটের লাগোয়া জানলা, জানলা দিয়ে একফালি আকাশ, ওদিকের সেই চানঘর, একটু উঁকি দিলে বাঁপাশের রান্নাঘর,  ওদিক দিয়েও আগে আসা যাওয়া হত। সাইকেল রেখে গলি দিয়ে এসে ঘরে ঢোকা যেত। কত কত যুগ আগে কারা সব বানিয়েছিল এসব বাড়ি। সে বাড়িও মনে হয় আর নেই সেইভাবে। আমার দু চারটে বই খাতা সব জায়গা ঘুরতো। মেসোমশাই ভালো অঙ্ক করাতেন, ছোটতে আমি অনেক সময়ই মেসোমশাইয়ের কাছে বসতাম অঙ্ক নিয়ে।  আস্তে আস্তে মাসির কলেজে গেছি কত বার। সেই আমার আরেক জগৎ দর্শন। বই সমুদ্র, বই পাহাড়। মা বসিয়ে দিয়ে শাড়ির দোকান হ্যানাত্যানা করে আসতো। আমি মাসির সব বন্ধুদের চিনতাম। তাঁদের মধ্যে সুচিত্রা  মাসি ছিলেন হাওড়ার আমাদের বাড়ির কাছের মানুষ। এই যে অনেকের সাথে আলাপ, মিশে যাওয়া,  এ আমায় বরাবরই তৃপ্ত করে।  মেজমাসির হাত ধরে বিক্রম বেতাল, হরিশচন্দ্র-শৈব্যা,পঞ্চতন্ত্র পড়া, কি সুন্দর ছবি দেওয়া দেওয়া সব বই। ক্লাসে উঠলেই বই পেতাম। মাধ্যমিক দিয়ে একটা দারুণ জীববিজ্ঞানের বাংলায় অভিধান উপহার পাই। এ বই আমার পরম সম্পদ ছিল।নানা ছবি তথ্যে ভরপুর সেই  বই। বায়োলজি বেজায় ভালো লাগতো। তাই এই বইয়ের হাত ধরে অনেককিছু  জানা-পাওয়া হয়েছিল। আমি হায়ারসেকেন্ডারি দিয়ে মা চেয়েছিল মেজমাসির কলেজে পড়ি। মেজ মাসি তার আগের বছর মানে ৯২ তে মনে হয় অবসর নেন। কিন্তু আমার কপালে মৌলানা আজাদ কলেজ ঝুলছিল, তবে আমার পড়াশোনার সময় যে কোনো বইয়ের জন্য,  বই দিতে নিতে কতবার যে ওই কলেজে গেছি। আমহার্স্ট স্ট্রীট নাম আর রামমোহন  কলেজ, সাথে কলেজ স্ট্রীট চেনা, ইন্ডিয়ান সিল্ক হাউস থেকে আশা ডালিয়া এসব নাম এই সূত্রে জীবনে গেঁথে গেল। আর ছিল মাসির আনা সেই কাপড়ের ব্যাগ। সেই ব্যাগ কাঁধেই আমার স্কুল জীবন,  কলেজ লাইফ পার হয়েছে। মাসির কলেজে কেউ ওই ব্যাগ নিয়ে আসতো, কাপড়ের ব্যাগের কি শক্তি আর নিতেও কি আরাম। মেজমাসির সূত্রেই নিবেদিতা স্কুল চেনা। সে গল্প নাহয় আজ তোলা রইলো অন্য কিস্তির জন্য।



স্কুল নিয়ে এত লিখি তাই এই লেখায় তেমন করে স্কুলবাড়ি আর লিখতে মন করে না। একটু স্কুল নিয়ে অন্য কিছু বলি। আমার ক্লাসের মেরে কেটে চার পাঁচজন ছিলাম হাওড়ার মেয়ে। হ্যাঁ, এভাবে আমাদের আলাদা করা হত, আমরা হাওড়ার মেয়ে। সে সময় কেউ কেউ আমার ক্লাসের ওই পুঁচকি বয়সেও, চশমাটা একটু নাকের উপর চাপ দিয়ে চোখ মুখ কুঁচকে হাওড়া বলতো, দিদিরাও বাপ রে হাওড়া বলতেন। আমরা লঞ্চে আসি তাই আমাদের একটু বেশি বন্ধুত্ব, এ ক্লাস সে ক্লাস মিলিয়ে আমাদের কিছু মিলমিশ গড়ে উঠতো। তাই বাকিদের সাথে চট করে বন্ধু হতে হয়ত সময় লেগেছিল। বাকিরা স্কুল বাসে যেত অনেকেই, তাদের একরকম গ্রুপ, যারা লোকাল তাদের এক রকম গ্রুপ, যারা পড়ায় দারুণ তারা একদল, যারা গানে ভালো, যারা নাচে ভালো, যারা কবিতা ভালো বলে, যে অঙ্কে ভালো, যে ইংলিশে ভালো এরকম অনেক অনেক দল। আমিও একটা এরকম দল খুঁজতাম। লঞ্চের দল বাদে আমার দলগুলো হল পিটি ক্লাসের দল, ফাঁকিবাজের দল, পড়া না পারার দল, অনর্গল বকে চলার দল, বৃষ্টি হলে জমা জল নিয়ে সবার গায়ে ছেটানোর দল, জানলা দিয়ে মাইকের গান, আকাশের ঘুড়ির প্যাঁচ দেখে মন উড়ে যাবার দল, অন্যের টিফিন সাঁটানোর দল, পড়াচলাকালীন যাবতীয় দুষ্টুমি করে দু কান কাটা থাকার দল। এগুলো আমার খুব নিজের দল। এসব দলের হয়ত আমি একাই সদস্য। আমিই সব। তবে এর বাইরেও কিছু দল ছিল, পাকা পাকা গল্পের দল, ক্লাস কেটে সায়েন্স বিল্ডিং এর পেছনে লুকিয়ে থাকার দল, স্কুল কাট মারার দল। আমি সেসবে ছিলাম না। ব্যাডমিন্টন খেলা, খো খো খেলার দলে আমি খুব থাকতাম। যাইহোক, এভাবে অত শাসন আমার পায়ে তেমন বেড়ি লাগাতে পারেনি। ওই কেউ ভালো বলবে তাই আমি ভালো এসব আমি ছোঃ মেরেছিলাম। এত নিয়ম এত আগল,  উফ আঃ আউচ জীবন পুরো।  অন্য ক্লাসের দিদিকে চিঠি লেখা পাপ, কাউকে জড়িয়ে ধরা বারণ, স্কুলে ছেলে ঢুকবে না, ক্যাম্পে যাবে কিন্তু হ্যা হ্যা হি হি না, আর পাঠাতেন আমার মত খলবল পাব্লিককে। আমি সোজাকে সোজা দেখি। তাকেও বোঝানো হয়েছিল ওই যে তুমি হেসেছিলে, ওদের সাথে আড্ডা মেরেছো তাই তুমি....  নাহ সেসব আর নাই বললাম, ওনারা বলতেন, যেগুলোর কোনো মানে বুঝিনি আজো। সিস্টারের সাথে এনাদের তখন গুলিয়ে ফেলতাম। অনেক কিছু বুঝে ফেলেছিলাম বড় হতে হতে।  তেমন স্টুডেন্টদেরও সবার বড় ল্যাজ গজাতো না এ স্কুলে পড়লেই। একটা সেকেন্ড ডিভিশন রেজাল্ট মানে তুমি ওই ইতর জাতি বিশেষ,  এসব খুব বুঝেছি। নিবেদিতা এসব চান নি মোটেই। তবে এখনো এক সুর,  এক হাতের লেখা, এক আলপনা, এক ডিসিপ্লিন সব মানলেও ওই হিটলারি শাসন আমরা জানি কি জিনিস। এই স্কুলে আমার কত বন্ধু, আজ নেটের দৌলতে কত যোগাযোগ।  এই স্কুল ফেরার কিছু মজার গল্প  না বললেই নয়। আমার এক হাওড়ার বন্ধুর তখন নতুন গাড়ি। আমরা তখন সেভেন এইট,  ও লঞ্চে আসা কমালো, রোজ ই গাড়িতে আসে, গাড়ি থাকতো স্কুলেই। আবার ওকে নিয়ে ফিরতো। এবার ছুটির সময় আমায় কোনো কোনো দিন সাধতো, সে সময় এত ভাবাভাবি ছিল না, আমি ওর সাথে গাড়ি চাপতাম। তখন একা ফিরতাম একেক দিন। বা বাড়িতে বলাও থাকতো আনতে না যেতে,  ওর সাথেই ফিরবো। সেই ফেরার সময় আমরা যে কত কি করেছি, গাড়ির কাচ তুলে কলকাতা দর্শন হত আমাদের। কি জ্যাম, ভিড়, পোস্তার ওখানে গাড়ি আটকে,  সাথে সেই বয়সের কিছু দুষ্টুমি এসব কোনোদিন ভুলবো না। আমার স্কুল যাতায়াতের আরেকটা উপায় ছিল আমতলা ওপি মিনিবাস। আমার হাওড়ার মল্লিক ফটক দিয়ে যে বাস রুট গেছে সেদিক দিয়ে এই বাসে চাপতে হতো।  আর সোজা স্কুল যাওয়া যেত। এই ভাবে আমি কলকাতা দেখতাম। পুঁটে কালী মন্দির আমার বিশেষ প্রিয় ছিল ওই রাস্তায় দেখার। এই কালীমায়ের এক একদিন একেক সাজ বাসের জানলা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখতে খুব ভালো লাগতো। সেই আমার স্থল পদ্ম চেনা, স্থল পদ্মে এই কালী মায়ের রূপ অসাধারণ।
বাস জার্নির কথায় মনে আসে সেই দোতলা বাসের কথা। হাওড়া বাস স্ট্যান্ড থেকে বেশ কিছু দোতলা বাস সে সময় যেত এদিক সেদিক। বেশ লাইন লাগত তার জন্য। আমার বড়পিসি বাড়ি করেন ডানলপের দিকে, এগারো নাম্বার বাস স্টান্ড স্টপেজে নেমে একটু হাঁটলেই পিসির বাড়ি। এগারো নাম্বার মানে ওই দোতলা লাল বাস। লাইন দিয়ে উপরে গিয়ে বসতাম। এসব ছোটবেলার খুব সুখ স্মৃতি।  পিসির বাড়ি সেই সময় দেখা এক দারুণ বাড়ি। সবকিছু আধুনিক ব্যাপার স্যাপার। একেক ঘরে একেক ডিজাইন, মোজাইক, রং, সিলিং, সিলিং ফ্যান সব একেক রকম। সেই প্রথম কমোড দেখা। ছাদে ওঠার আগে হাফ ছাদে একটা ঘর। সেটা আমাদের আড্ডাখানা ছিল। পিসির দুই ছেলে, জ্যেঠুর ছেলে মেয়ে  আমরা সবাই কতবার গেছি, থেকেছি। আমার বড় হবার অনেক স্মৃতি ওই বাড়িতে। পিসেমশাই আই.এস.আই. এর অধ্যাপক।  সেই সূত্রে আজ এই দেশ, কাল সেই দেশ ঘুরতেন। আমার বড়পিসি টেলিফোন ভবনে চাকরি করতেন। কিন্তু এই  বার বার  বাইরে যাবার ফলে সেই চাকরি ছেড়ে দেন। আমাদের ছোটবেলার মস্ত পাওয়া হল  পিসির হাতের বিরিয়ানি।  পিসিও এদেশ সেদেশ ঘুরে কার কাছে সেই আমলে বিরিয়ানি রাঁধা শিখলেন। সে বিরিয়ানির স্বাদ আজো কোনো বড় হোটেল ভোলাতে পারেনি। তখন মায়ের হুজুগ ওঠে ওই বিরিয়ানি শেখার। তাই রবিবার সক্কাল সক্কাল আমরা এসে যেতাম এক একদিন। এই সময় মনে হয় মায়েদের রান্নাঘরে সাম্বার মশলার চল শুরু হয়। এই বিরিয়ানি মশলা, সাম্বার মশলা মা বেশ অনেকটা করে স্টক করে আনতো পিসির থেকে বা পরে নিজেও বানাতো। সেসব গন্ধ আজো নাকে লেগে। পিসির বাড়িতে আমাদের কম্পুটার দেখা, দেখা প্রথম সাদাকালো টিভি, তারপর রঙীন টিভি। সাথে সেই ভিডিও ক্যাসেটের হিড়িক উঠলো। তাই পিসির বাড়ি মানেই সিনেমা দেখা। হেঁটে দাদা ভাইবোন মিলে ডানলপের একটা লাইব্রেরি থেকে মাঝে মাঝে নতুন সিনেমা এনে দেখা। আর কিছু ক্যাসেট ঘরে ছিল, সেরকম কিছু প্রায় মুখস্ত হয়ে গেছিল আমার। এন্টার দ্য ড্রাগন,  ব্রুস লি, র‍্যাম্বো, হিন্দিতে অমিতাভের কিছু সিনেমা আর বিশেষ করে বলার 'প্যায়ার যুক্তা নেহি'। এখন যেমন বাচ্চাদের হাতে মোবাইল পৃথিবী দেখায় আমাদের সময় ওই ভিডিও ক্যাসেট খুলে দিয়েছিল অনেক বন্ধ দ্বার। আমার পিসেমশাইকে নিয়ে একটু না বললে এ লেখা অসম্পূর্ণ থাকে। হাওড়ার ছেলে, বেড়ে ওঠা, প্রচন্ড মেধাবী মানুষ, খুব আস্তে কথা বলেন আজো। আমাদের দেখা এক প্রচন্ড লেখাপড়ার জগতের মানুষ।  নাম ডঃ পরিমল মুখোপাধ্যায়।  স্ট্যাটিস্টিক্সের অনেক বই আছে ওনার লেখা। শেষ একবার গেছিলাম ও বাড়িতে, সেও বছর চার হবে,  দেখি পিসেমশাইয়ের বইয়ে ভরা আলমারি। আমরা সারাদিন দেখতাম, ডাইনিং টেবিল বা খাট জোড়া ওনার বই খাতা। ওনার হাতের লেখা দেখার মত। আর অগাধ ঈশ্বর ভক্তি, চেতনা। ছোটতে দেখতাম অনেকেই ওনাকে হাত দেখায়,  আজ ওনার যে কতকিছুর উপর  বই তার ইয়ত্তা নেই। এসব আমি অত বুঝে সাজিয়ে লিখতে পারবোনা। তবে কাছ থেকে দেখা এক বড় মাপের মানুষ উনি। আজ পিসি নেই,  পিসেমশাই একা ওই বাড়িতে থাকেন। মাঝে মাঝে বিদেশ যান ছেলেদের কাছে বা নিজের কাজে। আজো লেখাপড়াই তাঁর সঙ্গী।
 পিসির বাড়ির পরে আরেক বাড়ি আমার দেখা ছোটমাসির বাড়ি। ছোটমাসি আমাদের ছোটতে উত্তর বঙ্গে থাকতেন। তার আগে ডায়মন্ড হারবারে অনেক দিন। ছোট মেসো পশ্চিমবঙ্গের ট্যুরিজম বিভাগে ছিলেন। এই আরেক মানুষ।  এরকম ফর্সা মানুষ কম দেখেছি। এত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসতেন কি বলবো। আর কিছু রুচিবোধ। খড়দায় ছোটমাসির বাড়ি আরেক আড্ডাখানা ছিল। এ বাড়িও হতে দেখা। মাসির বাড়ির গৃহপ্রবেশে কতদিন গিয়ে থাকা, এই বাড়িও কি সুন্দর করে তৈরি হয়। আর লাগোয়া বাগান। এখানে আমি প্রথম ঘরের চটি, বাইরের চটি, বাথরুমের চটি, পা মুছে খাটে ওঠা, হাত ধুয়ে খেতে বসা এসব খুব শিখেছি। শেখা মানে রক্তে গাঁথা। এই ছোট মেসো যেহেতু ওই হোটেল লাইফ দেখেছেন তাই খুব পরিস্কার ব্যাপারটা মানতেন। সে সময় আমরা বাবা কাকাদের ঘরের কাজে কম দেখতাম। দেখলেও কাপড় কাচা, আয়রন করা এসব।  কিন্তু এই মেসো আমার ডাস্টিং করতেন অসাধারণ।  জানলার রেলিং থেকে মাটির পুতুল কিম্বা জলের জাগ সব উনি দেখতেন খুঁটিয়ে।  মেসোর কথা তো হল। আসি মাসির কথায়। আমার দেখা আরেক সৌখিন মানুষ।  খুব খেতে ঘুরতে ভালোবাসতেন। গানের গলা অসাধারণ।  আগেও বলেছি যে দারুণ শ্যামাসংগীত, ভজন গাইতেন।  এই মাসির শ্বশুর বাড়ি আমার মামারবাড়ির উল্টোদিকের বাড়িতে। ও বাড়িতেও এক কালে অনেক গেছি। ওখানে মেসোর ছোট ভাই, তার পরিবার থাকতো, আর মাসীরা ছূটিছাটায় আসতেন। এই সময় বাগবাজার বাড়িতে আড্ডা বসতো। এই আড্ডা মানেই ছিল খাওয়া দাওয়া।  তাই আমরা ছোট থেকেই নানান চপের স্বাদ পেয়ে বড় হয়েছি। বেঁটেমামার আনানো প্যান্থেরাস, ডেভিল, ফিস্ফ্রাই আজো মুখে লেগে। ছোটমাসি খুব ভোজন রসিক ছিলেন। আজ কালের স্রোতে মেসোরা নেই আর, দুই মাসিই এক ঘর জীবন কাটাচ্ছেন। কিন্তু দুজনের গলাতেই আজো সুর খেলা করে। এই দুই বাড়ি নিয়েই আবার আসবো।

দ্যুতি।