Thursday, July 18, 2019
গোছগাছ আর আমি
গোছগাছ আর আমি
দ্যুতি মুস্তাফি
দুনিয়ার অনেক মজাদার কম্বো থাকে, কম্বিনেশন আর কি, আমি আর গোছগাছ ঠিক সেরকম একটা ব্যাপার। অনেকদিন ধরে ভাবছি, এটা নিয়ে একটু ভাটাবো। কিন্তু সেই গুছিয়ে বসার ই সময় হচ্ছিল না। অনেক ভেবে দেখেছি, এই ব্যাপারটা বাড়ির গুণেই হয়। তবে আমাদের বাড়ির অনেক সদস্য ছিলেন তো। তাই কার কোন টা যে আমায় গ্রাস করেছে কে জানে। বাড়ির কর্তা দাদু তো বিশাল ফিটফাট মানুষ ছিলেন। কিন্তু দাদুর কিছুই পাই নি তেমন। দাদুর গোছ কম্পিউটার স্টোরেজ সিস্টেমকেও হার মানাবে। দাদুর খাট, দাদুর স্যুটকেস, আলমারি যে কোন জিনিস এমন কি গামছা, লুঙ্গি, বিড়ি, দেশলাই, চটি, রুমাল সব নিয়ে বড় রচনা নামানোই যায়। আর সে বাড়ির গিন্নি আমার ঠাকুমা এসবের ধার দিয়ে যেতেন না। লোক আসবে বলে আমাদের বাড়িতে সাজো সাজো রব তেমন শুনি নি। কারণ সর্বদাই তো কেউ না কেউ এসেই আছে। এতগুলো মানুষ, কচিকাচার দল সেখানে জায়গার জিনিস জায়গায় হলেই গোল বাঁধতো। কত জোড়া চটি জুতোই থাকতো বাড়িতে। থালা বাসন, বিছানা পত্তর ছেড়েই দিলাম। এই আটপৌরে ব্যাপার দিয়ে আমি যে বিশাল গুছোন্তে হয়ে উঠবো না সে তো মালুম ই হয়। পড়তে পড়তেই বিয়ে করেছি, সে সময়ের বই এর তাক কেমন ছিল কিম্বা টেবিল সেগুলো ভাবি আজ। বই নামলে উঠতো না। উঠলে নামতো না। কাজের থেকে অকাজের জিনিস বেশি থাকতো। বিছানায় ক্যাসেট, পেন, খাতা এসব টইটম্বুর। তবু আমি সে বাড়িতে আলনা গোছাতাম, বড় আলমারির বই এর যাবতীয় দায়িত্ব রাখতাম। আরো অনেক কিছু। বিয়ের সময় খাট বিছানা দিতে গিয়ে আমার কাকা এসে বলে,ও বাড়ি নাকি বিশাল সাজানো। অত বড় বাগান একটাও শুকানো পাতা নেই। তখন এসব কি আর বুঝতাম, ভাই তার আগে গেছিল, এসে বলেছিল, ওদের নাকি সবুজ দেওয়াল, সবুজ বেসিন, সবুজ ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন। কিন্তু সে সবে আমি কিছুই বুঝি নি। এগুলো দিয়ে একটু হলেও আমার গোছানো সত্তা বুঝছেন! বিয়ে হয়ে ও বাড়ি গেলাম। জীবনের সব রহস্য রোমাঞ্চের শুরু। একজন সাঁতার না জানা লোক কে জলে ফেলে দিলেও আমার থেকে ভালো পারফর্ম করবেন। প্রচুর খোরাকি গল্প স্টকে। সব ওগড়াবো কি না খুব কনফিউজড। তাও শুরু করা যাক।
ফুলশয্যার রাতের গল্পটাই আগে বলি। সেই ব্রকেড চাদর, ফুল দিয়ে সাজানো। গোলাপের পাপড়ি দিয়ে ভরাট। মাঘ মাসে বেশ ঠান্ডা, তার উপর ই শুয়েছিলাম দুজনে। আহা ফুলশয্যা আর নাহলে বলা কেন বাপু। সকালে উঠে কেলোর ব্যাপারটা বুঝলাম। ফুলের পাপড়িগুলো বেচারা চেপ্টে চাদরে এমন রং আর গন্ধ ধরালো যা জীবনে ভুলবো না। বহুকাল সেই রং অটুট ছিল। সাথে আমার কত্তার পাঞ্জাবিটাতেও যেটা আকবর আলি থেকে বানানো হয়েছিল, এই মহান কীর্তিটি বেশ অনেক কাল এদিক সেদিক সবাই ওই পাঞ্জাবিতে দাগ লেগেছে বলে আহা উহু করে বলতেন। আর আমি ততোই লাল হয়ে উঠতাম। সেই রং নিয়ে রংবাজি শুরু। বিয়ের সময় সব ম্যাচিং ম্যাচিং। সব নতুন। নিজের জামা, সালোয়ার কাচতাম,ধুতাম হয়ত বিয়ের আগে, কিন্তু এই নতুন ব্লাউজ, পেটিকোট এসব? সাথে বরের হাল্কা রং জামা কিম্বা শ্বশুর মশাইয়ের গেঞ্জি এসবকেও রংীন করে ফেলেছি। সেই পর্বটা ওই ছেলে মেয়ের নতুন জামা প্যান্ট কাচার ক্ষেত্রেও হয়েছে। কাচাকুচির মর্ম টর্ম বুঝতে অনেক কাল লেগেছে। বিছানার চাদরের সাথে মোবাইল কিম্বা এসির রিমোট মাঝে মাঝেই মেশিনে ঘুরেছে। প্যান্ট জামার পকেটের জিনিসের কথা নয় ছেড়েই দিলাম। মাঝে মাঝেই পে স্লিপ, দশ কুড়ির নোট কেচে সাফ হয়ে যেত। নোটের পাশে শূন্য তোমরা লাগিও। নোট বা রুমাল অনেক সময়ে ইস্তিরি হয়েও পকেট থেকে বেড়িয়েছে। আর মাঝে মাঝেই দেশলাই কাঠিগুলো ভেসে উঠতো মেসিনে। আমার শাড়ি পরা নিয়েও অনেক গল্প, সব শাড়িই সেই নিবেদিতা স্কুলের লাল পাড় সাদা শাড়ি ভাবতাম। সেই শাড়িতে যেমন কাবাডি খো খো সব হত তেমন বালুচরি, বেনারসি, কাঞ্জিভরমেও ছেলে মেয়ের দই তোলা সাথে হাগু মুতু সব লাগিয়ে ফিরতাম। বরটাও কম বয়েসি ছিল, একবার বলেছিল, কত দামের শাড়ি সেটা সাঁটিয়ে রেখো, নইলে কেউ বুঝবে না তোমার ছিরি দেখে। কোথাও বেড়াতে গিয়ে এক দুটো করে শাড়ি ফেলে টেলেও এসেছি। সাথে থাকতো খোঁচ লেগে ছেঁড়া। এদিকে সংসারের জাঁতা বেশ বনবনিয়ে ঘুরছে, ছেলে মেয়ে হয়ে নাকানি চোবানি জীবন। বিনা গুছিয়েই সংসার চলছে। ড্রেসিংটেবিল এ বোতল, সেরেল্যাক এসব জায়গা পেতে লাগলো। মেয়ে একদিন দেখি সব রকম টিপ গোটা গাল কপালে লাগিয়ে যত লিপ স্টিক আছে ঠোঁট চিবুকে মেখে চোখে আচ্ছা সে কাজল ঘষে সেজে রেডি। সেই শুরু হল সব সরানো। বাইরের ঘরের নীচের দুটো তাকে ওরা হাত পেত বলে মোটামুটি খালি রাখা হত। আজো রাখা হয়নি ড্রেসিংটেবিলের সেসব গুছিয়ে আর। আজ ই দেখি ড্রেসিংটেবিল জুড়ে অনেক গুলো গোল্ড ফ্লেক। আমার হাত ব্যাগের ছোট চেনে কটা টিপের পাতা, দু চারটে লিপ স্টিক, সিঁদুরের স্টিক, আর কিছু দুল থাকে। মেন বড় খাপেএকটা চিরুনি আর সান গ্লাস। একটা ক্রিমের টিউব। ওটাই ড্রেসিংটেবিল আমার। ছেলে মাঝে মাঝেই ওই ক্যাসেটের ফিতে খুলে ঘরে ছড়াতো, একবার উলের গোলা নিয়ে এ ঘর থেকে সে ঘর গোল গোল ঘুরে নিজেই জড়িয়ে যাবার দশা। এসব সামলাতে হিমসিম খেতাম। সব থেকে মজার ব্যাপার, এই নতুন কলোনিতে শিফট হয়ে এসে খুব ছিনতাই এর উপদ্রব। তাই আর সোনা দানা ঘরে নেই। যখন সোনার দুল পরতাম তখন সেসব এদিক সেদিক গড়াতো। আর আজ পাঁচ টাকা জোড়ার তিন জোড়া দুল আমার বড্ড যত্নের। পরে যখন খুলে রাখি যত্ন করে ওই ব্যাগের ছোট খাপে নিজেই হাসি খুব। এক একটা লিখছি আর একগাদা স্মৃতি উপচে আসছে। আমাদের বাইরের ঘরে মোটামুটি সব থাকে। ঘরে ঢুকেই আগে একটা বাঁদিকে সেল্ফ ছিল। এই সেল্ফ নিয়েও গল্প আছে, কোলিয়ারি এলাকার কারপেন্টার, তাকে দিয়ে আমি নতুন গিন্নি কিছু কাঠের জিনিস বানাই। তাতে ওই সেল্ফটাও ছিল। সেও মহান, আমিও মহান। স্বস্তিক চিহ্নটা ঠিক ই করেছে, কিন্তু ওটা টাঙানোর যে হুক সেটা উলটো দিকে করে, সেই থেকে উলটো স্বস্তিক আমার ঘরে। অনেক সুহৃদ কিম্বা শুভাকাঙ্ক্ষী বৌদি দাদারা এসে বলে গেছেন, এটা কিন্তু রাখা ঠিক নয়। কারণ জানতে বলতেন, স্বস্তিক চিহ্ন উলটো এটা বাস্তু, ফেংস্যুই এসবে খুব বাজে বলে। -ও, হ্যাঁ, আচ্ছা এসব বলে দেঁতো হাসি হেসে পার পেতাম। মনে মনে সেই থেকে কোথাও জেদ জমতো। কি হয় উলটো স্বস্তিকে? আজো ওটা আছে তেমন ই। সংসার শুরুতে সেটায় ছোট টেপ রেকর্ড, ওয়াকম্যান, সব চাবি টাবি এসব থাকতো। তারপর ঘড়ি, মোবাইল এসব আরো সব বিল, পে স্লিপ এসবও। মা, বাবারা এলেই বলত, এমন ঘরে ঢুকতেই এসব রাখিস, কেউ নিয়ে যায় যদি! টি টেবিলের তলায় রাখা হত ছেলে মেয়ের খেলনা। ওদের সেই খেলনা সারা মাটি ছড়ানো থাকতো।পাশের কোয়ার্টারের বৌদি এসে বলতেন, তোর বাড়ি এলে আতংক লাগে। সারা মেঝে খেলনা, মুড়ি ছড়ানো, বিছানায় স্কেচ পেন, পেনের কালি, বই পত্তর, দেওয়ালে আঁকিবুঁকি, চ্যবনপ্রাশ এর আল্পনা। মাঝে কলোনিতে অগোছালো বলে বেশ আখ্যাও পেয়েছিলাম। আমি আর আমার কত্তার কিছু মজার ট্রিক ছিল। কেউ আসবে শুধু দশ মিনিট আগে জানাক, আমাদের ঘর গোছানো হয়ে যেত। যথারীতি আমি ওসব পাটে যেতাম না। আমি কি খাওয়াবো দেখতাম আর ও সব গুছিয়ে আমায় বলতো, দেখো তো! আমি একটা ওয়াও মার্কা হাসি দিতাম। হাসি মেলাতে মেলাতেই গেস্ট ফেস্ট এসে হাজির। কেউ অত বুঝতো কি না জানতাম না, তবে নিজেরা কি মজাই না পেতাম। সেই ট্যাঁপা টেঁপির গল্পের মত কেস, সুখ সব, ও আমায় খাটের তলা দেখাতো, দেখলাম সব সেখানে। কিম্বা আর কোনো দেওয়াল আলমারিতে ঠুসে দেওয়া হয়েছে প্লাস্টিকে ভরে। সেসব জিনিসের আর তেমন দরকার পরতো না রোজের জীবনে। কিন্তু যে দিন ওই কোনো জীবন বীমার কাগজ কিম্বা এসির ওয়ারেন্টি পিরিয়ড এর কাগজ খোঁজা হত সেদিন ওসবে চিরুনি তল্লাসি চলতো। খুব কঠিন হত বছর শেষের সপ্তাহটা। ছেলে মেয়ের স্কুলের নানা ঢং, সাথে রোজের রিহার্সাল কিম্বা ক্লাব গেম কিম্বা পিকনিক, সব মিলিয়ে ভিতরের ঘরের খাট জামাকাপড়ে বোঝাই হয়ে যেত। কত্তার আবার স্যুট প্যান্ট সব সেট না বার করে, চারটে জামা পরে না দেখলে হবে না। প্রতিবারেই আক্ষেপ ঝুড়িঝুড়ি। আমাদের সব ঠিক থাকে, ওর কিছু নেই। যেহেতু সারা দিন রাত খনিতে পরে থাকতো, ওর এই বাইরের পরার জামাটামা বিশেষ দেখা হত না আর কি। ওই লিকলিকে শরীরে সব ই যেন কেমন লাগে। তেনার মটকায় ধোঁয়া বেরুলে চুপ থাকাই শ্রেয়। যেন কি হচ্ছে আমি কিছুই জানি না। শেষে কিছু একটাতে থিতু হতেন। ততক্ষণে চারটে সিগারেট দু কাপ চা হয়ে গেছে। এই সব রইলো, বাড়িতে এক আমি ই থাকি। তাই আমার দায় সব ঠিক করা। এই লোড নিতে পারতাম কিন্তু ফট ফট করে ঘর গোছানোটায় আজো খুব অপটু।
মনে মনে ভাবি খুব হাই ফাই পোস্টে চলে গেলে, ওই মেন্টেন ফেন্টেন করতে হলে গেছি আর কি। তাই বরের খুব বেশি পদোন্নতি আমার মোটে কাম্য নয়। একটাও বড় অফিসারের বৌ আমার মত ল্যাদেশ্বরী নন। আমি একটিও দেখিনি। যা দিনকাল এসেছে, ছিমছাম, আটপৌরে এসব কথাই আর থাকবে না। এক দাদা আমার বাড়ি এলেই বলেন, তোর বাড়িতে এলে বেশ বাড়ি বাড়ি ফিলিং হয়। অন্যদের বাড়ি গেলে হোটেলে এসেছি মনে হয়। হ্যাঁ, এটাই জীবনের পরম পাওয়া। তবে আমার ফেসবুকীয় এলবাম ইত্যাদি সাজানো দেখে লোকজন এটা মেলাতে পারে না 🤣। আমি আজো এক আছি, হয়ত কিছুটা শিখেছি। সমাজ বড় দায়। সেই সাথে এমন মোটা চেহারা, লোকজন এমনি ই দু য়ে দু য়ে চার করে। এখন বর ও বুঝেছে এ মাল পাল্টাবার নয়, তাই ও অনেক ম্যানেজ দেয়। আমাকে একা ছেড়ে দিলে তাবড় হোস্টেল পিজির ছেলে ছোকড়ারাও হেরে যাবে। গেল ডিসেম্বর এ ছেলের কিছু বন্ধু এসে ছিল কদিন। তারা প্রায় বলেই ফেলছিল, ইয়ে ঘর তো হোস্টেল জায়সা হি হ্যায়।
যাক সক্কাল সক্কাল আমি গুছোন্তের গপ্প পড়ে ফেলুন, আজ এক্সট্রা এনার্জি পাবেন ই পাবেন। বিছানা তুলতে গিয়ে এই শর্মাকে স্মরণ করবেন। আজ লেপ টা আর পাট না করে সারাদিন ওমনি ফেলে রাখতে পারেন। বালিশ যেখানে ছিলে সেখানেই থাক না। মশারী? আরে আজ তুলবেন না। সারাদিন এ ঘরে আর কাজ কি বলুন তো? যত সব অলক্ষ্মীর কথা? আপনার লক্ষ্মী আজ হয়ত বেশি শুতে চাইছে এমন করে ভাবুন না। আর আপনিও কাজের ফাঁকে একটু এসে লেপে পা দুটো ঢুকিয়ে বসুন। দেখবেন আমাকে এসে ভালোবাসতে মন করবে। প্রচুর চেনা জানা এসব পড়ে বুঝবে এ আমার দ্বারাই সম্ভব, ওদের বলে বোঝাতে পারি না ল্যাদে কি সুখ!
নাহ, চলি। কে এসবের কোর্স করতে চান জানাবেন। অগ্রিম বুকিং চলছে। আপনার শরীর আপনার মন, আপনি ভালো রাখুন। আমায় নিয়ে খিল্লি ওড়ান। আজ চলি।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment