Pagesবিষয় কাশ্মীর অনেকদিন ভাটাইনি, নিজের প্রচন্ড ব্যস্ততা সাথে কিছু মনের খিচখিচানিতে লিখতে মন করছি

Monday, August 5, 2019

মেরা কুছ সামান

মেরা কুছ সামান ক্লাস টুয়েলভে মেয়ে স্কুল থেকে একটা কাপড়ের গোলাপ পেয়েছিল। প্রথম কলেজ যেতে বাড়ি ছাড়লো, প্রথম পিছুটান, মা আঁকড়ে রইলো এত সার্টিফিকেট, এটা ওটা, সেটা। ওই গোলাপটা ছিল আমার আলমারির লকারে। গত শিফটিং এ সেটা ঠাঁই পেল অন্য আলমারির ড্রয়ারে। এবার ড্র‍য়ার খালি করেছে তার বাবা। আমি সে সময় অন্যকিছুতে ব্যস্ত, হয়তবা হোয়াটসঅ্যাপেই, বেডরুমে এসে দেখি সেই গোলাপ মাটিতে গড়াচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে ড্রয়ার খুলে দেখি সব খালি। বুঝলাম কেস। আমার হাওড়া বাড়িতে কত কি ফেলে এসেছিলাম। বিশেষ করে বই খাতা, জামা টামা কিছু আর সাধের ওই ইমিটেশন দুল হার। আর সাইকেল খানা। বিয়ে মানেই কত কি। বাবা যে ওই বাড়ি ছেড়েই চলে যাবে অন্য বাড়িতে এসব ভাবিইনি কোনোদিন। পৈতৃক ভিটে, তালা আটকে রয়েছে কত কাল। উই এর আস্তানা। আমার জীবন তখন তুঙ্গে, ছেলে মেয়ে বড় করতে নাকানিচোবানি খাচ্ছি। যখন ফুরসত হল হাওড়া বাড়ি গিয়ে দেখি খাতাপত্র সব উই লাগা, যে জিনিস গুলো যে জায়গায় রেখেছিলাম কিছু নেই। পাগলের মত ছোট বেডসাইড খুলে খুঁজেছিলাম সেই ছোট্ট সবুজ, হলুদ দুল গুলো। মাকে বলতে মা বললো, কে জানে। হঠাৎ একটা মাটির টেরাকোটার বালা পেলাম। ওটার কথা তো মনেও ছিল না,সাথে মনে এলো সেই হাতির দাঁতের চওড়া বালাখানা? নাহ সেটাও পাইনি। বাড়ি বদল খুব বাজে জিনিস। বার বার স্মৃতি লোপাট হয়ে যায়। আর এই কোয়ার্টারস জীবন, ছোট ঘুপচি ঘর হলে তো গেল। মেয়ের গোলাপ টা এবারের দায়ে বেঁচে গেল। সেবার ধানবাদে শিফটের সময় হারিয়েছে মূল্যবান একটা প্যাকেট। ও প্যাকেটে ছিল অনেক কার্ড। মা বাবার বিয়ের, আমাদের, ছেলে মেয়ের ভাতের, ভাইয়ের আরো কত বন্ধু বন্ধবের। খুব ভারী মোটা প্যাকেট। তখন আমার এত ডাস্ট প্রবলেম যে আর খুঁটিয়ে সব দেখতে পারিনি। কত্তা আশ্বাস দিয়েছিল, ফেলিনি ফেলিনি আছে সব। নাহ সেটা নেই আর। সোনার একটা দুল হার গয়না আমায় এভাবে টানে না। কিন্তু বার বার এই ছোট, তেমন কিছু না জিনিসগুলো বুকটা মুচড়ে দেয় হারিয়ে গিয়ে। জীবনের সার বুঝেছি, ওই ছোটবেলাই ভালো। আর সব বাজে। আমার হাওড়া বাড়ি ছাড়ার পর আর কিছুই টানে না আমায়। তবে ছেলেমেয়ের জীবনে এসবের একটু গুরুত্ব রাখতে চেষ্টা করি। খুচরো জিনিস নতুন বাসায় নিয়ে গিয়ে কাল কিছু খুলে খুলে বস্তা খালি করে এলাম। সেবার কিছু এরকম বস্তা আর খুলিইনি, লফটে তুলে রেখেছিলাম। লফটে ছিল উই য়ের বাসা। এত জিনিসে ছোটখাটোগুলো স্মৃতির অতলেই যায়। তাই জানতাম ওই বস্তায় বাসন ভরা। কাল মনে হল ওই বস্তাগুলোই খুলি আগে। তাতে দেখি তিনটে খেলনা গাড়ি উইতে খেয়েছে। তাদের রিমোট অব্ধি রাখা ছিল শক্ত কাগজের খাপে। মনে পরলো সেই ভাইয়ের আনা শক্ত কাটবোর্ডের জিগ জ্যাগ পাজল বক্সের কথা। এরকম দেওয়াল আলমারির মাথায় রাখা ছিল। হঠাৎ একদিন নামাতে গিয়ে দেখি শুধু উপরের খাপ, ভিতর টা পুরো খেয়েছে উইতে। ঝাড়খন্ডের কয়লাখনিতে বাস। ব্যাপারটা বুঝলাম। মনকে বোঝালাম যে জঙ্গল কেটে এই বাসা বাড়ি বানিয়ে থাকা। এখানে উইদের আদি বাস। তাদের সাথে লড়াইটা লড়ে লাভ নেই। প্রতি বছরের সব বাঙলা পত্রিকা নিতাম, পড়তাম। শুরুর দিনে এই বড় খাটের ডিভান ভর্তি থাকতো সানন্দা, দেশে। আস্তে আস্তে জিনিস বেড়েছে, সেসব সরে বালাপোস, কার্পেট, চাদর, বালিশ এসব জুটলো ডিভানে। কেউ কেউ অবাক হত ডিভানে বই শুনে। এদিকে এমন মানুষও আছেন যারা এই বই রাখার কদর বোঝেন না। আমার গায়ে সোনা নেই টা বেশি গুরুত্ব পায়। এখন সব বুঝি। কত রকমের মানুষ। সবাই কি আমার মত ক্ষ্যাপা হবে? কিন্তু সেই সানন্দা, দেশ যা ছিল আমার অবসর, কলকাতার খবর, ফ্যাশন,খাবার দাবারের আপডেট দিত, পুজোবার্ষিকীর গল্প উপন্যাসে দিন কাটাতাম সেসব এক সময় বড় বোঝা হয়ে উঠলো। ছেলে মেয়ের মোটা মোটা বই জায়গা কাড়লো। বুক ভাঙ্গে আমার বার বার। মন শক্ত হয়,চোয়াল আরো বেশি। সব গুছিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জে হারি বার বার। একটা বস্তা থেকে কালো কঙ্কালের মত কি বেরুলো? ছবি তুলে হোয়াটস্যাপ ক্লোজ গ্রুপে দিয়ে বললাম, অরিন্দমের দেওয়া প্রথম গিফট। অরিন্দম নিজে লিখলো,মরা চামচিকা? ইচ্ছে করছিল আবার তুলে রাখি সেটুকুই। সেই ববি সিনেমার সিন, সেই ডান্সিং পুতুল কাচের খাপে মনে পড়ে। এক একটা জিনিসে কত স্মৃতি জড়িয়ে লুকিয়ে। চামচিকেটাকে হোয়াটসঅ্যাপ এডিটে আউট লাইন দিয়ে পোস্টালাম। এসব সময় বার বার এক তুমহারে কান্ধে কা তিল মনে আসে বড্ড। মেয়ের কলেজের এম এ ক্লাসের শুরুতে একবার প্রিয় গানের ব্যাখ্যা আর নিজের জীবন দিয়ে মেলাও সেটা যে কেন প্রিয়,ফোনে এসব আলোচনা চলে আমাদের, আমি বলি শুনেই মেরা কুছ সামান? ও বলে হ্যাঁ, কিন্তু মেলাবো কি করে? কেমন বুঝিয়েছিলাম ওকে,সব সময় কি প্রেমে পরলেই এসব গান কথা হয়? আর লিখতে গেলে সব কি সত্যি লিখতেই হবে নাকি? বানিয়ে ফেল বাকিটা। কিন্তু আমি সেটুকু আশাও রাখি যে বানাতে হবে না,কিছু এরকম অভিজ্ঞতা এ বয়সে হয়েছে নিশ্চয়ই। যাইহোক, কি লিখছি নিজেও জানি না। মাথার কিঞ্চিৎ গোলমাল শুরু হলেও হতে পারে। প্রেমিকের দেওয়া প্রথম গিফট, সেটা মরা চামচিকে ভাবা যায়? ওই টেবিল ল্যাম্প নিয়ে বুক দূর দূর করে বাড়ি ঢোকা।কিনলাম না কুড়িয়ে আনলাম সে ফিরিস্তি দাও বাড়ির পাঁচ ভূতকে। ওই আলো জ্বালিয়ে কত চিঠি নেমেছে রাতে, কিছু না হলেও সুইচ টক টাক করে কত অবসর কেটেছে বিরহের। সে আজ মরা চামচিকে। হাসবো না কাঁদবো। আমার হেল্পার সেই পুরানো লক্ষ্মণ মাঝি বোঝে না কেন ছবি তুলছি।

No comments: