Monday, August 5, 2019
সং ই সার
সং ই সার
কি ভাই এই সংসার? এতদিনে কিছুটা হলেও বুঝেছি। বিয়ের পর এটা চার নাম্বার কোয়ার্টারস বদল। মুনিডিতে দুটোতে থেকে ধানবাদের দু আড়াই বছর হাওয়া খেয়ে আবার মুনিডিতে সেকেন্ড ইনিংস এর জন্য যাচ্ছি। এই ক বার বাসা বদলে বুঝেছি সংসার কি? অনেক জামা কাপড়, আরো অনেক বাসন কোসন, আরো অনেক বই খাতা এক হলে একটা জম্পেশ সংসার হয়। তাতে থাকবে দীর্ঘদিনের আবর্জনা, যার সবটাকেই বুকে আঁকড়ে বলতে ইচ্ছে করবে, ও মা এটা? এটা আমার বড্ড দরকারি, ও মা ওটা ফেলছো কেন, ওটা তো ওমুকের দেওয়া প্রথম গিফট, ওহো ওই প্লাস্টিকগুলো দিয়ে তো সব্জি রাখি, আরে ওই কাগজ টুকরো দিয়ে কোলাজ করবো ভাবি, আরে কাঠের টুকরোগুলো ফেলে দিও না, কবে কি গোঁজ মারতে লাগে, আরে পাইপের মুখটা ওখানের নলে ফিট হয়ে যাবে হয়ত, এ বাবা এই বাক্সগুলো ফেলে দিলে? ওই দিয়ে...
আমার মত গুছোন্তেদের এরকম কেজো বর টর পেলে জীবনটা কিছু বর্তে যায় বটে, তবে আমি বসে ওই কেউ কাজ করছে দেখতে পারি না। দয়ার শরীর। তাই মটকা দিয়ে ধোঁয়া বেরোয় মাঝে মাঝে। লোকজনের মত আমার ওসব হ্যাংলাপনা নেই যে সারাক্ষণ সিগু টানবো আর চায়ে চুমু খাবো। আমি ক্ষ্যাপা মানুষ। শিফটিং এর দুদিন আগেও তাই ফ্রিজ থেকে চিলি চিকেন বেরোয়। চার পদ রেঁধে রাখতে পারি। মুস্কিল হল ভগবান সবাইকার দমের চাবিটা এক বানান না। আমার দশ পাক দমে এক বেলা গেলে ওর দু দিন চলে যায়। যাইহোক, একটু অন্য কথায় আসি। এই যে বার বার শিফটিং এর কু ফল, সুফল এসব বলি।
গতবার প্যাকার্স ডেকে বুঝে গেছি ব্যাপারটা। বড় বস্তা এনে সব ভরে ফেলো আর গায়ে লিখে দাও বেড রুম, ড্রয়িং রুম এসব। তাই এবার নিজেরাই বস্তা এনে সব টুকরো জনিস গোছাতে লাগি আর এক ট্রিপ দু ট্রিপ করে রোজ উনি আপিস যাবার সময় দিয়ে আসেন। প্রথম গেল বই খাতা। তারপর ডিভান দুটো খোলা হল। এই দুবছর ওই জিনিসগুলো বের ই করিনি। তাই বুঝলাম মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই। আগামী পাঁচ কিম্বা পনেরোতেও ওরা ওভাবেই বন্দী থাকবে। সেবারেও ভেবেছিলাম সারিয়ে নেবো। এবারে বুঝলাম ভুল ভেবেছি। তাই পুরানো ওই কেক ওভেন,ছাল ওঠা স্যান্ডউইচ মেকার, কিছু প্লাস্টিকের এটা ওটা এসব এবার বাতিলের লিস্টে। তাও সাহস করে বলি ওটা থাক না, সারিয়ে নেবো, যেন কোনো বুনো নেকড়ে তাড়া করলো, একটা সেই প্লাস্টিকের লেবুর রস করা বাটি। ও বলে , এটা আর কি হবে? আরে এটা আমার ছোটবেলার জানো? এসব হুজুং ভুজুং দিয়ে ওটা রাখা গেল। একটা খেলনার এক দেড় হাত লম্বা বন্দুক প্লাস্টিকের ই। নাহ, ওটা গতবার নিয়ে এলেও এবার আর নিয়ে যাবার কোনো কারণ পেলাম না। কিছু মান্ধাতা আমলের স্যুটকেস,ব্যাগ। উফ, কেন যে ফেলতে এত কষ্ট। নেহাৎ দু একটা উই খেয়েছে তাই বৃষ্টিতে বাইরে ছুঁড়ে দিলাম বাগানের দিকে। মনে হল ওরা চেঁচিয়ে বলছে, শুধু উই খাওয়া বলেই আমাদের এমন কদর! এ আর্তনাদ শুনতে পাই যে আমি। পরের দিন রোদে আধ ভেজা ব্যাগগুলো দেখে আমার সংসারী মন বলে ওঠে ওর পকেটগুলো দেখে নে রে মরা। ও মা, ঠিক এক খান নেক সেট বেরিয়ে এল। নিজেকে নিজে গাল দিলাম, কিল চড় কি আর দেওয়া যায়, এই নেক সেট টার কথা তো ভুলেও গেছি, বুদ্ধের মুন্ডু লাগানো লাল কালো পাথর গার্নেটের, এক নেট বন্ধুর থেকে নিয়েছিলাম। খুব পছন্দের ছিল। একেই হারা নিধি বলে। একটুও মরচে ধরে নি বা কিছু হয়নি। কি যে আনন্দ লাগলো। মেয়ের বকুনি মনে পড়লো, সেও বলে তুমি কিচ্ছু ঠিক করে রাখো না। কি আর করা। সবাই সব পারে না। আমার অগোছালোপনা ঘোচাতে এবার একটা চিপ লাগানো হবে মাথায় শুনছি। এবার আরো বড় কিছু ছেড়ে যাচ্ছি। তার মধ্যে আমার সেই সাধের ট্রেডমিল। বড় শখ ছিল ছিলিম হবো, মানে হবোই হবো। প্রায় দশ বছর বয়স তার, কতটুকু আর বেড়েছি, ওই মেরে কেটে দশ ই হবে। নিন্দুকেরা সেদিন বলেছিল, এটা ওই কাপড় শুকানোর কাজে দেবে। হে হে, নিন্দুকদের টোটা ভরা অভিশাপের গোলা (গুলি নয় কিন্তু) কদিন পর ই কাজে দিয়েছিল। তাও তাকে সেবার এনেছিলাম, কিন্তু ঘরে ঢোকাইনি, গ্যারেজে ছিল এই দু বছর। এ অপমান সে আর নিতে পারেনি। এবার সে গোঁ ধরেছে, ও জামাইবাবু, আমি যাবো না মুনিডিতে। জামাইবাবুর ভারী খেয়ে কাজ পরেছে ওকে নিয়ে যাবে, ছেলেকে বললাম, ছবি তুলে OLX মে ডাল দে, সে তো আরো ল্যাদের পাব্লিক। ভাবলাম নিজেই নিলাম টা হাঁকবো, কিন্তু আর মন করে নি। তবু এই লেখা পড়ে কোনো সহৃদয় পাঠক সেটি উঠিয়ে নিয়ে যেতেই পারেন। ছেড়ে যাবো বাপের রক্ত জল করে কেনা সেই খাটের গদি। নাহ, কোনো যৌতুক ফৌতুক না, বাপ শখ করে কটা ফার্নিচার দিয়েছিল। এসব নিয়ে ইতিহাস লেখার ইচ্ছে আছে। ভাগ্যি দিয়েছিল, তাই মাঝে মাঝেই গর্জাই এটা আমার খাট, বাপের দেওয়া। এই হুঙ্কারেই কত রাতে সেই পাণিপথ, কুরুক্ষেত্র অধরা থেকেছে। তা সেই গদি খানা বহুবার ট্রাই নিয়ে আর পালটানো হয় নি। এবার করেই ছাড়বো পণ। গদিটার আত্মকাহিনী লিখতে গেলে ভালো পানু গপ্প হয়ে যাবে। না মানে আমার খোকাখুকুদের হিসু হাগু বমি সবের টাচ আছে তাতে। দেখো ছোঁয়া আর টাচে বিস্তর ফারাক হয়ে যায় কিন্তু, সেই বিখ্যাত ডায়লগ টা তখনই বিখ্যাত হয়ছিল টাচের ছোঁয়ায়- আপনি কিন্তু আমায় টাচ করবেন না। না মানে যা বলছিলাম আমার সাধের প্রেমের ইতিহাসকে রেখে যাচ্ছি। গুলজার টুলজার তো নই, তাই ওভাবে নিকতে পারি নে কো। আমার সাদা সাপ্টা কথা। এই গদি সেই গদি, সেই যে সেই, সেই প্রথম রাত, দ্বিতীয়, তৃতীয়... সেই যে সিগু খেয়ে ফেলেছিলে, ধিকি ধিকি আগুনে গদিও কিছুটা মুখ পোড়ালো, সেই যে বাচ্চা পার্টি এসে ধামসাতো, সেই যে সবাই কাগজ পেতে এর উপরেই ডিনার করলাম, এ গদি সেই গদি। ভাদ্দর এলে রোদে দিতে দম ছুটতো। যাইহোক সেই গদিতে তেইশ বছরের প্রেমের কাদার থেকেও বেশি লেগেছে কোলিয়ারির ধুলো। তাই কঠিন কর্তৃপক্ষ হতে গেলে এসবকে বাঞ্চাল করতে হয়। তাই গদি তুমি থাকো হেথা, আমি চলে যাই। নাহ, নতুন গদি এসে গেছেন। এতকালের সম্পক্ক মাঝে মাঝে নিজেও হুমকি পাই, এই গদির হাল করে ছাড়বো,সব ই যখন নতুন হচ্ছে... ওদিকে টিভিতে কলের জলের মত তালাক নিয়ে কিসব চলছে কানে এল। পৃথিবীতে এ কদিন কত কি ঘটছে, সব মাথার অনেক উপর দিয়ে হুশ হুশ করে যাচ্ছে। দুনিয়া এখন আমার ওভেন, আমার একোয়াগার্ড, আমার টিউব, আমার ফ্যানে লটকে। গতকাল বাসন তুলতে গিয়ে একদম মিনিমামোস্ব মিনিমাম কিছু রাখলাম। ভাবছিলাম আহা এটুকু দিয়েই যখন চলে তখন কেন যে এত আদেখলাপনা কে জানে। ছেলে এসব সার বুঝেছে। জীবনে খুব স্বল্প রিকয়ারমেন্টে চলে সে। সব থেকে ছোট ব্যাগটা নিয়ে যায়, সব থেকে কম জামা প্যান্ট তার, সবেতে বলে আর কি হবে মা! দু হাত ভরে আশীর্বাদ করি এটাই সার বুঝে থাকিস, আর কি হবে! জীবনটা হয়ত আরো বড় হবে। ও হ্যাঁ, বলা হয় নি, আর কি হবে বলতে গিয়ে কিছু নতুন গেস্টের কথা মনে এল। দুটি এসি নতুন এন্ট্রি নিলেন, এবার দাদাবাবু বললেন একদিন আর একজস্ট না, কুচিনা লাগিয়ে দেবো তোমায়। ব্যাস, বাক্যিবাণ, আমি লুফে নিয়ে গিয়ে অর্ডার দিয়ে এলুম, নতুন যন্ত্রের সাথে মুকালাত হবে। একটা ওয়াশিং মেশিনের জন্য কত প্যানপেনিয়েছিলাম গত শিফটিং এ, বাবুর বড় মন ছিল জানতুম। এবার একটা মিষ্টি ফুটফুটে ওয়াশিং মেশিন এলো। আমার কুড়ি বছরের বুড়িয়ে যাওয়া মেশিনটাও আপাতত থাকছে নিয়ে যাবার লিস্টে। ট্রেডমিল, গদি কিম্বা ওই বন্দুকের মত সেও থেকে যেতে পারতো। কিন্তু কথা হল মালিক পক্ষ সার্ভিস দেখে, বুঝলেন। আপনার রঙ চটে গেছে, কলকব্জা কবে বেরিয়ে কঙ্কাল সার আপনি, ওটো স্টপ ফপ কবেই বিগড়েছে, কিন্তু... এই শুধু কিন্তু গুলোর জন্য আপনি এখনো থাকছেন স্যার। কি কিন্তু? সে ঘোরে, অটো নয় এখন সে নন স্টপ ঘোরে। তার ড্রায়ারে কোনো প্রব্লেম নাই। তাই সে আজো আমাদের। আবার খাদের জীবন, তাই তাতে ওই খাদের জামাকাপড় কাচা হবে। কাচা হবে পাপোশ টাপোশগুলো। সুয়োরানী দুয়োরাণীর গপ্প এখানে আর কি। দেখি কি ক্ষীরের পুতুল গড়ি?
শুক্রবার যত তাড়াতাড়ি পারি চলে যাবো নতুন ঠিকানায়, প্যাকার্সরা এসে জিনিস ওঠাতে যতক্ষণ। কেমন কাটলো দুবছর? বুঝলাম বুড়িয়ে গেছি অনেকটা। বোধ বেড়েছে তের গুণ। নতুন করে মিশে মায়া বাড়াতে মন হয় নি আর। তাই তেমন পিছুটান নেই কিছু। শুধু ছেলের হোস্টেলটা খানিক দূর হল এই যা। যখন ছানাপোনা থাকে তখন ঘুপচি ঘর আর এখন হাওদাখানা। গিয়ে আবার সং সেজে সার খুঁজবো আর কি। একটু শেষে আমার লীলার লীলামাহাত্মটা গেয়ে যাই। ধন্য তিনি। তাঁর যে যে লীলা আমি দর্শন করেছি তাই দিয়ে জীবনের অনেক বোধ নিয়ে যাচ্ছি। এভাবেও কাজ করা যায় বলে একটা পাঁচালি নামালে মন্দ হয় না। নাহ, যাবার সময় সুখস্মৃতিগুলোই থাক। এসব আওড়ে আর লাভ নেই। কয়লানগরে সুভাষ মাছ দিতো, স্বপন সব্জি আর সনত আয়রন করতো। এদের ভুলবো না। এরা মানুষ খুব ভালো। শহরের এক রকম কালচার। যেটা তেমন করে নিতে পারলাম না। বাইশ বছর মাটির কাছের মানুষগুলোকে বড্ড চিনেছিলাম। ওদের সারল্য আবার বাঁচাবে আমাদের হয়ত। এখানে সব ফেলো কড়ি মাখো তেল ব্যাপার। ওখানেও হয়ত তাই। কিন্তু আমরা বুঝতে চাই নি সেটা। বার বার মন লাগিয়েছিলাম সবেতে। আজো মুনিডির পেপার আঙ্কেল, দুধ আঙ্কেলরা (ছেলেমেয়ের ডাক) কি খুশি আমাদের দেখে। সেই সরলতার টানেই আবার যাচ্ছি হয়ত। আবার খুঁজবো দোবরু পান্না, ভানুমতীদের আমার আরণ্যকে।।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment