Pagesবিষয় কাশ্মীর অনেকদিন ভাটাইনি, নিজের প্রচন্ড ব্যস্ততা সাথে কিছু মনের খিচখিচানিতে লিখতে মন করছি

Sunday, August 18, 2019

বিষয় কাশ্মীর

বিষয় কাশ্মীর অনেকদিন ভাটাইনি, নিজের প্রচন্ড ব্যস্ততা সাথে কিছু মনের খিচখিচানিতে লিখতে মন করছিল না। আমি যখন শিফটিং নিয়ে ব্যস্ত কাশ্মীর নিয়ে কত কি হয়ে গেল। কি হল, কেন হল, ভালো না মন্দ এসব অনুধাবন করার জন্য খুব সামান্য আমি, আর আমার ভাবনা বাকিদের সাথে মিলবেও না হয়ত। তবে ২০০৭-৮ এ কাশ্মীর ভ্রমণ টা জীবনের অন্যকিছু পাওয়ার মধ্যে একটা এটাই ভাবি আমি। খুব কাছ থেকে যে গুলো দেখেছি সেগুলোই বলতে মন করছে। রাজনীতি বুঝি না। ভালো মন্দ এমনিই কম বুঝি। আমরা চারজন, আমাদের দুদিকের বাবা মা আর সাথে আমাদের বন্ধু পরিবার, প্রণবদা, অজন্তা আর তাদের দুই ছেলে, সব মিলিয়ে বারো জন গেছিলাম। আমাদের বেশির ভাগ থাকার ব্যবস্থা করেন আমার হাওড়া বাড়ির তিন পুরুষের শাল বিক্রেতা রফিক ভাই। রফিকের বাবাও আসতেন এক কালে আমাদের বাড়ি। মা বাড়ি বদলেছে রফিক সেখানেও যায় মাঝে সাঝে। সম্পর্ক কতটা ভরসার হলে সেই সময় রফিক কে দিয়ে আমরা এসব উপকার নিই সেটা বোঝাতে চাইছি আর কি। বেশ মনে আছে রফিক ভাই জম্মু থেকেই আমাদের সাথে যোগাযোগ করে, একটা আলাদা সিম দিয়ে হোটেলের কাগজ টাগজ দিয়ে দেন। সে সময় মোবাইল এত ছড়ায়নি, রোমিং কাটতো বেশ, তাই ওই লোকাল সিম টা যে খুব উপকারে লেগেছিল বলাই বাহুল্য। ডাল লেকের একদম কাছে একটি হোটেল, বলাবাহুল্য তার নামটাও হিন্দু মার্কা কোনো ঠাকুর দেবতা সংক্রান্ত ছিল, সেটির চারটি ঘর আমাদের জন্য আর খুব যথাযথ খরচায় আমরা ছিলাম। আমরা কেউ মহাপুরুষ নই, তাই এই বারো জনের বারো রকম বায়নাক্কা, তায় আবার বেড়াতে এসেছি। ছেলে মেয়েরা কিছুটা বাপ মা বাড়ি পরিবার দ্বারা চালিত। বেশ ছোট তখন। তবু ওতেই বাচ্চারা চিরকাল এডভান্স থাকেই। আবার সাথে প্রাচীন প্রবীণরাও। আর জায়গা কাশ্মীর। সোজাসুজিই বলি, আমার শাশু মা সেই গোত্রে পরেন যেখানে মুসলিম হোটেল? তাদের খাবার? এসব নিয়ে নাক উঁচুপনা ছিল। তাই চারবেলা খাবার জন্য যেমন ভাবতে হয়েছে তেমন আরো অনেক কিছু নিয়েই একটু বুঝে চলতে হয়েছিল। আমরা ফেসবুকে এসে সবাই খুব উদার হয়ে যেতে পারি, কিন্তু ঘরের গল্পগুলো তবু থাকেই। সেই সময় অনেক দিন বন্ধ থাকার পরে আবার কাশ্মীর খুলেছে। তাই ড্রাইভার, হোটেল বয়, শিকারার চালক সবাইকেই আমরা গোগ্রাসে গিলতে চেষ্টা করেছি। আমরা তো সেই সবজান্তা বাঙালি রে বাবা। আমি বেশ ভুলো তাই সব মনে নেই আর, যে টুকু আছে সেগুলো বলি। প্রথম ড্রাইভার ছিলেন একজন টাক মাথা ভদ্রলোক। তাঁকে এক রাশ কৌতূহল নিয়ে কত প্রশ্ন করতে করতে আসি আমরা। কোথাও খুব বেমানান কিছু পাই নি। যে টার যেমন উত্তর তেমনই দিচ্ছিলেন। এরপর ওই হোটেলের মানুষগুলি, সবাই হয়ত মুসলিম কিন্তু কি ভালো মানুষ সে আজো মনে আছে। আমি রোজ খুব ভোরে উঠে ডাল লেকে যেতাম একাই। সামনে রাস্তা পেরোলেই লেক। ওনাদের গেট বন্ধ থাকতো।কিন্তু রোজ খুলে দিতেন আমি গেলেই। সে সময় অর্কুটের জামানা। প্রথম সেই ডিজি ক্যাম হাতে। যা দেখি সব ক্যাম বন্দী করতে মন করে। সূর্যোদয়ের ছবি ভিডিও কিছু ছাড়িনি। রাস্তায় কত মানুষ। কেউ জগিং করছেন, কেউ হাঁটছেন কেউ ছবি তুলছেন আমার মত। তবে স্থানে স্থানে আমাদের ফুল বডি সার্চ বা প্রায় সর্বত্র সিকিউরিটি দাঁড়িয়ে এগুলো ছিলোই। আমরা এক একদিন এক এক দিকে খেতে যেতাম। বড় হোটেল থেকে শুরু করে ছোট গুমটি সবেতেই খেতাম। শাশু মা কে তেমন হলে একেক দিন বৈষ্ণব ধাবাতে খাইয়ে আমরা এদিক সেদিক খেয়েছি। দেখেছি ঠ্যালায় কাবাব এটা সেটা বিক্রি হচ্ছে। আমার নিজের তেমন কোনো ব্যাপার না থাকলেও মা বাবাদের সেই চোখ বোজা শাসনের জন্য ওসব চেখে দেখা হয়নি যদিও সে যাত্রায়। তবে সব জায়গায় এত দারুণ খাবার খেতাম যে কি বলবো। একটা ছোট গুমটি তে ডিমের ওমলেট আর ব্রেডের নেশায় পরে গেছিলাম। সব জায়গাতেই আমার অন্তত টার্গেট ছিল লোকাল মানুষ। বেড়াতে গেলেই নিবেদিতা স্কুল, ভূগোলের মানসীদিকে খুব মনে হয়। দিদি আজ আর নেই, কিন্তু দিদির দৌলতে কিছু শিক্ষা এমন বপন করেছি যে কোনো জায়গায় গেলেই কিছু সার্ভে করা, সেখানের সব গল্প খুব টানে আমায় চিরকাল। সেই নেশাতেই সবার সাথে কথা বলেছি। কেনাকাটার দোকানে গিয়ে যে সব মানুষ পেয়েছি তাঁদের সাথেও খুব বকেছি। কি করে এসব বানায়, এটা ওটা সেটা কত কি। শিকারার চালকদের জীবন ও বুঝতে তাদের নানা প্রশ্ন করেছি। যারা ওই ফুলের পসরা নিয়ে ঘোরেন কিম্বা লেকের মাঝে সেই আখরোট কাঠের কাজ করে চলা বৃদ্ধ মানুষ টি, সবাই আমার কাছে চরম বিস্ময়ের, সবার জীবন পড়ার নেশা কাশ্মীর ট্রিপের অন্যতম আকর্ষণ ছিল আমার। রফিক ভাই তাঁর বাড়িও নিয়ে যান আমাদের।আমার শাশুমার মত গোঁড়া মানুষও ওই কদিনে সব ভুলতে শিখলেন। তাঁদের মিষ্টি ব্যবহার তাঁর মনেও নতুন জানলা খুলে দিয়েছিল। আমার জীবন অনুধাবন করতে ভালো লাগে।তাই দিয়ে মামুনির ব্যাপারটা বুঝি। উনি বরিশালের মেয়ে। ওনার পাঁচ ছ বছরের জীবনে দেখা সেইসব স্মৃতি উনি কি ভুলতে পারেন! যাইহোক, রফিকের বাড়ির আপ্যায়ন জীবনে ভুলবো না। রফিকের বউকে কি সুন্দর দেখতে, বাড়িতে অনেক সদস্য। সবাই কি আন্তরিক। আমাদের জফরান চা খাওয়ালেন। সাথে দারুণ সব খাবারের আয়োজন ছিল। রফিকের বাড়ির আপ্যায়ন আমরা জীবনে ভুলবো না। সেদিন ই রফিকের সাথে তাদের শাল তৈরি কারখানা দেখতে যাই। সাথে ওদের যে হোলসেল দোকান সেখান থেকে কেনাকাটা করি। আমার শাশু মা কেনাকাটা পেলে সব ভুলে যান, তাই এই কদিনে তিনিও ওই ভুলতে বসেছিলেন মুসলিম দোকান, যাবো কি যাবো না ইত্যাদি। এরকম অনেক কথা মনে আসে কাশ্মীর বললেই। এক একটা দিন এক এক দিকে বেড়াতে যাওয়া, সর্বত্র এই মানুষগুলিকে ভীষণ মাটির কাছের, ভীষণ প্রাণখোলা মনে হয়েছে। নিজেদের ছোট ছোট চাওয়া পাওয়া দিয়ে বেশ শান্তিতে কাটানো প্রাণ এঁদের। এই যে এত কার্পেট গালিচা বানানো, তার জন্য ছোট ছোট হাত মাকু ধরে যে ধৈর্য নিয়ে তাঁরা এসব করেন এর মূল্য কি আমরা দিতে পারি? ওই যে আখরোট কাঠের কাজ, বুড়ো মানুষটিকে দেখে কি যে বিস্ময় আর ভালো লাগায় ভরেছিলাম কি বলবো। কি অদ্ভুত নিপুণতা দরকার সে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। এই বেড়ানো ঘিরে কত কত জীবিকা তাঁদের। একটা শান্ত মন ওদের। এর সাথেও লুকিয়ে থাকে কত না বলা জীবন কথা। জীবনের লড়াই রোজ লড়ছেন এঁনারা। সীমান্তের যে সব কাহিনী আমরা বুঝি সেসব কথা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা। এসব নিয়েই কাশ্মীর। সেই কাশ্মীর কে নিয়ে এসব যখন শুনি চারদিকের খবরে বা মিডিয়ায় হতাশ লাগে। আমরা দিতে কতটুকু পারি? খালি নেবার জন্য লোলুপ হাত বাড়াই। কশ্মীরের দুদিকের সবুজ ক্ষেতে দৃষ্টি পড়েছে তাদের, ইয়ে হাসিন বাদিয়া ইয়ে খুলা আসমান, সেখানে এবার শিল্প দেখবো,দেখবো কালো কুন্ডলীর ধোঁয়া বেরুচ্ছে বড় বড় পাইপ থেকে, লিডারের জলে পেট্রোল, নোংরা মিশবে, চারদিকে ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে ভরে যাবে। এর ই তো নাম বিজ্ঞান। সভ্যতা। সব বুঝলাম, আশা রাখি তবু বেঁচে থাকবে ওই নিষ্পাপ মুখগুলোর সরলতা। নির্মল হাসি। রিন রিনে কথা। ডাল লেকে আর ঝপ করে সূর্য ওঠা দেখা যাবে না। অনেক উঁচু বিল্ডিং এর ফাঁক দিয়ে উঠতে উঠতে সূর্য এ আর সেই কুসুমাভা পাবো না। বিশ্বায়ন কাশ্মীরের দোরগোড়ায়। কে আটকায় তাকে?

Monday, August 5, 2019

সং ই সার

সং ই সার কি ভাই এই সংসার? এতদিনে কিছুটা হলেও বুঝেছি। বিয়ের পর এটা চার নাম্বার কোয়ার্টারস বদল। মুনিডিতে দুটোতে থেকে ধানবাদের দু আড়াই বছর হাওয়া খেয়ে আবার মুনিডিতে সেকেন্ড ইনিংস এর জন্য যাচ্ছি। এই ক বার বাসা বদলে বুঝেছি সংসার কি? অনেক জামা কাপড়, আরো অনেক বাসন কোসন, আরো অনেক বই খাতা এক হলে একটা জম্পেশ সংসার হয়। তাতে থাকবে দীর্ঘদিনের আবর্জনা, যার সবটাকেই বুকে আঁকড়ে বলতে ইচ্ছে করবে, ও মা এটা? এটা আমার বড্ড দরকারি, ও মা ওটা ফেলছো কেন, ওটা তো ওমুকের দেওয়া প্রথম গিফট, ওহো ওই প্লাস্টিকগুলো দিয়ে তো সব্জি রাখি, আরে ওই কাগজ টুকরো দিয়ে কোলাজ করবো ভাবি, আরে কাঠের টুকরোগুলো ফেলে দিও না, কবে কি গোঁজ মারতে লাগে, আরে পাইপের মুখটা ওখানের নলে ফিট হয়ে যাবে হয়ত, এ বাবা এই বাক্সগুলো ফেলে দিলে? ওই দিয়ে... আমার মত গুছোন্তেদের এরকম কেজো বর টর পেলে জীবনটা কিছু বর্তে যায় বটে, তবে আমি বসে ওই কেউ কাজ করছে দেখতে পারি না। দয়ার শরীর। তাই মটকা দিয়ে ধোঁয়া বেরোয় মাঝে মাঝে। লোকজনের মত আমার ওসব হ্যাংলাপনা নেই যে সারাক্ষণ সিগু টানবো আর চায়ে চুমু খাবো। আমি ক্ষ্যাপা মানুষ। শিফটিং এর দুদিন আগেও তাই ফ্রিজ থেকে চিলি চিকেন বেরোয়। চার পদ রেঁধে রাখতে পারি। মুস্কিল হল ভগবান সবাইকার দমের চাবিটা এক বানান না। আমার দশ পাক দমে এক বেলা গেলে ওর দু দিন চলে যায়। যাইহোক, একটু অন্য কথায় আসি। এই যে বার বার শিফটিং এর কু ফল, সুফল এসব বলি। গতবার প্যাকার্স ডেকে বুঝে গেছি ব্যাপারটা। বড় বস্তা এনে সব ভরে ফেলো আর গায়ে লিখে দাও বেড রুম, ড্রয়িং রুম এসব। তাই এবার নিজেরাই বস্তা এনে সব টুকরো জনিস গোছাতে লাগি আর এক ট্রিপ দু ট্রিপ করে রোজ উনি আপিস যাবার সময় দিয়ে আসেন। প্রথম গেল বই খাতা। তারপর ডিভান দুটো খোলা হল। এই দুবছর ওই জিনিসগুলো বের ই করিনি। তাই বুঝলাম মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই। আগামী পাঁচ কিম্বা পনেরোতেও ওরা ওভাবেই বন্দী থাকবে। সেবারেও ভেবেছিলাম সারিয়ে নেবো। এবারে বুঝলাম ভুল ভেবেছি। তাই পুরানো ওই কেক ওভেন,ছাল ওঠা স্যান্ডউইচ মেকার, কিছু প্লাস্টিকের এটা ওটা এসব এবার বাতিলের লিস্টে। তাও সাহস করে বলি ওটা থাক না, সারিয়ে নেবো, যেন কোনো বুনো নেকড়ে তাড়া করলো, একটা সেই প্লাস্টিকের লেবুর রস করা বাটি। ও বলে , এটা আর কি হবে? আরে এটা আমার ছোটবেলার জানো? এসব হুজুং ভুজুং দিয়ে ওটা রাখা গেল। একটা খেলনার এক দেড় হাত লম্বা বন্দুক প্লাস্টিকের ই। নাহ, ওটা গতবার নিয়ে এলেও এবার আর নিয়ে যাবার কোনো কারণ পেলাম না। কিছু মান্ধাতা আমলের স্যুটকেস,ব্যাগ। উফ, কেন যে ফেলতে এত কষ্ট। নেহাৎ দু একটা উই খেয়েছে তাই বৃষ্টিতে বাইরে ছুঁড়ে দিলাম বাগানের দিকে। মনে হল ওরা চেঁচিয়ে বলছে, শুধু উই খাওয়া বলেই আমাদের এমন কদর! এ আর্তনাদ শুনতে পাই যে আমি। পরের দিন রোদে আধ ভেজা ব্যাগগুলো দেখে আমার সংসারী মন বলে ওঠে ওর পকেটগুলো দেখে নে রে মরা। ও মা, ঠিক এক খান নেক সেট বেরিয়ে এল। নিজেকে নিজে গাল দিলাম, কিল চড় কি আর দেওয়া যায়, এই নেক সেট টার কথা তো ভুলেও গেছি, বুদ্ধের মুন্ডু লাগানো লাল কালো পাথর গার্নেটের, এক নেট বন্ধুর থেকে নিয়েছিলাম। খুব পছন্দের ছিল। একেই হারা নিধি বলে। একটুও মরচে ধরে নি বা কিছু হয়নি। কি যে আনন্দ লাগলো। মেয়ের বকুনি মনে পড়লো, সেও বলে তুমি কিচ্ছু ঠিক করে রাখো না। কি আর করা। সবাই সব পারে না। আমার অগোছালোপনা ঘোচাতে এবার একটা চিপ লাগানো হবে মাথায় শুনছি। এবার আরো বড় কিছু ছেড়ে যাচ্ছি। তার মধ্যে আমার সেই সাধের ট্রেডমিল। বড় শখ ছিল ছিলিম হবো, মানে হবোই হবো। প্রায় দশ বছর বয়স তার, কতটুকু আর বেড়েছি, ওই মেরে কেটে দশ ই হবে। নিন্দুকেরা সেদিন বলেছিল, এটা ওই কাপড় শুকানোর কাজে দেবে। হে হে, নিন্দুকদের টোটা ভরা অভিশাপের গোলা (গুলি নয় কিন্তু) কদিন পর ই কাজে দিয়েছিল। তাও তাকে সেবার এনেছিলাম, কিন্তু ঘরে ঢোকাইনি, গ্যারেজে ছিল এই দু বছর। এ অপমান সে আর নিতে পারেনি। এবার সে গোঁ ধরেছে, ও জামাইবাবু, আমি যাবো না মুনিডিতে। জামাইবাবুর ভারী খেয়ে কাজ পরেছে ওকে নিয়ে যাবে, ছেলেকে বললাম, ছবি তুলে OLX মে ডাল দে, সে তো আরো ল্যাদের পাব্লিক। ভাবলাম নিজেই নিলাম টা হাঁকবো, কিন্তু আর মন করে নি। তবু এই লেখা পড়ে কোনো সহৃদয় পাঠক সেটি উঠিয়ে নিয়ে যেতেই পারেন। ছেড়ে যাবো বাপের রক্ত জল করে কেনা সেই খাটের গদি। নাহ, কোনো যৌতুক ফৌতুক না, বাপ শখ করে কটা ফার্নিচার দিয়েছিল। এসব নিয়ে ইতিহাস লেখার ইচ্ছে আছে। ভাগ্যি দিয়েছিল, তাই মাঝে মাঝেই গর্জাই এটা আমার খাট, বাপের দেওয়া। এই হুঙ্কারেই কত রাতে সেই পাণিপথ, কুরুক্ষেত্র অধরা থেকেছে। তা সেই গদি খানা বহুবার ট্রাই নিয়ে আর পালটানো হয় নি। এবার করেই ছাড়বো পণ। গদিটার আত্মকাহিনী লিখতে গেলে ভালো পানু গপ্প হয়ে যাবে। না মানে আমার খোকাখুকুদের হিসু হাগু বমি সবের টাচ আছে তাতে। দেখো ছোঁয়া আর টাচে বিস্তর ফারাক হয়ে যায় কিন্তু, সেই বিখ্যাত ডায়লগ টা তখনই বিখ্যাত হয়ছিল টাচের ছোঁয়ায়- আপনি কিন্তু আমায় টাচ করবেন না। না মানে যা বলছিলাম আমার সাধের প্রেমের ইতিহাসকে রেখে যাচ্ছি। গুলজার টুলজার তো নই, তাই ওভাবে নিকতে পারি নে কো। আমার সাদা সাপ্টা কথা। এই গদি সেই গদি, সেই যে সেই, সেই প্রথম রাত, দ্বিতীয়, তৃতীয়... সেই যে সিগু খেয়ে ফেলেছিলে, ধিকি ধিকি আগুনে গদিও কিছুটা মুখ পোড়ালো, সেই যে বাচ্চা পার্টি এসে ধামসাতো, সেই যে সবাই কাগজ পেতে এর উপরেই ডিনার করলাম, এ গদি সেই গদি। ভাদ্দর এলে রোদে দিতে দম ছুটতো। যাইহোক সেই গদিতে তেইশ বছরের প্রেমের কাদার থেকেও বেশি লেগেছে কোলিয়ারির ধুলো। তাই কঠিন কর্তৃপক্ষ হতে গেলে এসবকে বাঞ্চাল করতে হয়। তাই গদি তুমি থাকো হেথা, আমি চলে যাই। নাহ, নতুন গদি এসে গেছেন। এতকালের সম্পক্ক মাঝে মাঝে নিজেও হুমকি পাই, এই গদির হাল করে ছাড়বো,সব ই যখন নতুন হচ্ছে... ওদিকে টিভিতে কলের জলের মত তালাক নিয়ে কিসব চলছে কানে এল। পৃথিবীতে এ কদিন কত কি ঘটছে, সব মাথার অনেক উপর দিয়ে হুশ হুশ করে যাচ্ছে। দুনিয়া এখন আমার ওভেন, আমার একোয়াগার্ড, আমার টিউব, আমার ফ্যানে লটকে। গতকাল বাসন তুলতে গিয়ে একদম মিনিমামোস্ব মিনিমাম কিছু রাখলাম। ভাবছিলাম আহা এটুকু দিয়েই যখন চলে তখন কেন যে এত আদেখলাপনা কে জানে। ছেলে এসব সার বুঝেছে। জীবনে খুব স্বল্প রিকয়ারমেন্টে চলে সে। সব থেকে ছোট ব্যাগটা নিয়ে যায়, সব থেকে কম জামা প্যান্ট তার, সবেতে বলে আর কি হবে মা! দু হাত ভরে আশীর্বাদ করি এটাই সার বুঝে থাকিস, আর কি হবে! জীবনটা হয়ত আরো বড় হবে। ও হ্যাঁ, বলা হয় নি, আর কি হবে বলতে গিয়ে কিছু নতুন গেস্টের কথা মনে এল। দুটি এসি নতুন এন্ট্রি নিলেন, এবার দাদাবাবু বললেন একদিন আর একজস্ট না, কুচিনা লাগিয়ে দেবো তোমায়। ব্যাস, বাক্যিবাণ, আমি লুফে নিয়ে গিয়ে অর্ডার দিয়ে এলুম, নতুন যন্ত্রের সাথে মুকালাত হবে। একটা ওয়াশিং মেশিনের জন্য কত প্যানপেনিয়েছিলাম গত শিফটিং এ, বাবুর বড় মন ছিল জানতুম। এবার একটা মিষ্টি ফুটফুটে ওয়াশিং মেশিন এলো। আমার কুড়ি বছরের বুড়িয়ে যাওয়া মেশিনটাও আপাতত থাকছে নিয়ে যাবার লিস্টে। ট্রেডমিল, গদি কিম্বা ওই বন্দুকের মত সেও থেকে যেতে পারতো। কিন্তু কথা হল মালিক পক্ষ সার্ভিস দেখে, বুঝলেন। আপনার রঙ চটে গেছে, কলকব্জা কবে বেরিয়ে কঙ্কাল সার আপনি, ওটো স্টপ ফপ কবেই বিগড়েছে, কিন্তু... এই শুধু কিন্তু গুলোর জন্য আপনি এখনো থাকছেন স্যার। কি কিন্তু? সে ঘোরে, অটো নয় এখন সে নন স্টপ ঘোরে। তার ড্রায়ারে কোনো প্রব্লেম নাই। তাই সে আজো আমাদের। আবার খাদের জীবন, তাই তাতে ওই খাদের জামাকাপড় কাচা হবে। কাচা হবে পাপোশ টাপোশগুলো। সুয়োরানী দুয়োরাণীর গপ্প এখানে আর কি। দেখি কি ক্ষীরের পুতুল গড়ি? শুক্রবার যত তাড়াতাড়ি পারি চলে যাবো নতুন ঠিকানায়, প্যাকার্সরা এসে জিনিস ওঠাতে যতক্ষণ। কেমন কাটলো দুবছর? বুঝলাম বুড়িয়ে গেছি অনেকটা। বোধ বেড়েছে তের গুণ। নতুন করে মিশে মায়া বাড়াতে মন হয় নি আর। তাই তেমন পিছুটান নেই কিছু। শুধু ছেলের হোস্টেলটা খানিক দূর হল এই যা। যখন ছানাপোনা থাকে তখন ঘুপচি ঘর আর এখন হাওদাখানা। গিয়ে আবার সং সেজে সার খুঁজবো আর কি। একটু শেষে আমার লীলার লীলামাহাত্মটা গেয়ে যাই। ধন্য তিনি। তাঁর যে যে লীলা আমি দর্শন করেছি তাই দিয়ে জীবনের অনেক বোধ নিয়ে যাচ্ছি। এভাবেও কাজ করা যায় বলে একটা পাঁচালি নামালে মন্দ হয় না। নাহ, যাবার সময় সুখস্মৃতিগুলোই থাক। এসব আওড়ে আর লাভ নেই। কয়লানগরে সুভাষ মাছ দিতো, স্বপন সব্জি আর সনত আয়রন করতো। এদের ভুলবো না। এরা মানুষ খুব ভালো। শহরের এক রকম কালচার। যেটা তেমন করে নিতে পারলাম না। বাইশ বছর মাটির কাছের মানুষগুলোকে বড্ড চিনেছিলাম। ওদের সারল্য আবার বাঁচাবে আমাদের হয়ত। এখানে সব ফেলো কড়ি মাখো তেল ব্যাপার। ওখানেও হয়ত তাই। কিন্তু আমরা বুঝতে চাই নি সেটা। বার বার মন লাগিয়েছিলাম সবেতে। আজো মুনিডির পেপার আঙ্কেল, দুধ আঙ্কেলরা (ছেলেমেয়ের ডাক) কি খুশি আমাদের দেখে। সেই সরলতার টানেই আবার যাচ্ছি হয়ত। আবার খুঁজবো দোবরু পান্না, ভানুমতীদের আমার আরণ্যকে।।

মেরা কুছ সামান

মেরা কুছ সামান ক্লাস টুয়েলভে মেয়ে স্কুল থেকে একটা কাপড়ের গোলাপ পেয়েছিল। প্রথম কলেজ যেতে বাড়ি ছাড়লো, প্রথম পিছুটান, মা আঁকড়ে রইলো এত সার্টিফিকেট, এটা ওটা, সেটা। ওই গোলাপটা ছিল আমার আলমারির লকারে। গত শিফটিং এ সেটা ঠাঁই পেল অন্য আলমারির ড্রয়ারে। এবার ড্র‍য়ার খালি করেছে তার বাবা। আমি সে সময় অন্যকিছুতে ব্যস্ত, হয়তবা হোয়াটসঅ্যাপেই, বেডরুমে এসে দেখি সেই গোলাপ মাটিতে গড়াচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে ড্রয়ার খুলে দেখি সব খালি। বুঝলাম কেস। আমার হাওড়া বাড়িতে কত কি ফেলে এসেছিলাম। বিশেষ করে বই খাতা, জামা টামা কিছু আর সাধের ওই ইমিটেশন দুল হার। আর সাইকেল খানা। বিয়ে মানেই কত কি। বাবা যে ওই বাড়ি ছেড়েই চলে যাবে অন্য বাড়িতে এসব ভাবিইনি কোনোদিন। পৈতৃক ভিটে, তালা আটকে রয়েছে কত কাল। উই এর আস্তানা। আমার জীবন তখন তুঙ্গে, ছেলে মেয়ে বড় করতে নাকানিচোবানি খাচ্ছি। যখন ফুরসত হল হাওড়া বাড়ি গিয়ে দেখি খাতাপত্র সব উই লাগা, যে জিনিস গুলো যে জায়গায় রেখেছিলাম কিছু নেই। পাগলের মত ছোট বেডসাইড খুলে খুঁজেছিলাম সেই ছোট্ট সবুজ, হলুদ দুল গুলো। মাকে বলতে মা বললো, কে জানে। হঠাৎ একটা মাটির টেরাকোটার বালা পেলাম। ওটার কথা তো মনেও ছিল না,সাথে মনে এলো সেই হাতির দাঁতের চওড়া বালাখানা? নাহ সেটাও পাইনি। বাড়ি বদল খুব বাজে জিনিস। বার বার স্মৃতি লোপাট হয়ে যায়। আর এই কোয়ার্টারস জীবন, ছোট ঘুপচি ঘর হলে তো গেল। মেয়ের গোলাপ টা এবারের দায়ে বেঁচে গেল। সেবার ধানবাদে শিফটের সময় হারিয়েছে মূল্যবান একটা প্যাকেট। ও প্যাকেটে ছিল অনেক কার্ড। মা বাবার বিয়ের, আমাদের, ছেলে মেয়ের ভাতের, ভাইয়ের আরো কত বন্ধু বন্ধবের। খুব ভারী মোটা প্যাকেট। তখন আমার এত ডাস্ট প্রবলেম যে আর খুঁটিয়ে সব দেখতে পারিনি। কত্তা আশ্বাস দিয়েছিল, ফেলিনি ফেলিনি আছে সব। নাহ সেটা নেই আর। সোনার একটা দুল হার গয়না আমায় এভাবে টানে না। কিন্তু বার বার এই ছোট, তেমন কিছু না জিনিসগুলো বুকটা মুচড়ে দেয় হারিয়ে গিয়ে। জীবনের সার বুঝেছি, ওই ছোটবেলাই ভালো। আর সব বাজে। আমার হাওড়া বাড়ি ছাড়ার পর আর কিছুই টানে না আমায়। তবে ছেলেমেয়ের জীবনে এসবের একটু গুরুত্ব রাখতে চেষ্টা করি। খুচরো জিনিস নতুন বাসায় নিয়ে গিয়ে কাল কিছু খুলে খুলে বস্তা খালি করে এলাম। সেবার কিছু এরকম বস্তা আর খুলিইনি, লফটে তুলে রেখেছিলাম। লফটে ছিল উই য়ের বাসা। এত জিনিসে ছোটখাটোগুলো স্মৃতির অতলেই যায়। তাই জানতাম ওই বস্তায় বাসন ভরা। কাল মনে হল ওই বস্তাগুলোই খুলি আগে। তাতে দেখি তিনটে খেলনা গাড়ি উইতে খেয়েছে। তাদের রিমোট অব্ধি রাখা ছিল শক্ত কাগজের খাপে। মনে পরলো সেই ভাইয়ের আনা শক্ত কাটবোর্ডের জিগ জ্যাগ পাজল বক্সের কথা। এরকম দেওয়াল আলমারির মাথায় রাখা ছিল। হঠাৎ একদিন নামাতে গিয়ে দেখি শুধু উপরের খাপ, ভিতর টা পুরো খেয়েছে উইতে। ঝাড়খন্ডের কয়লাখনিতে বাস। ব্যাপারটা বুঝলাম। মনকে বোঝালাম যে জঙ্গল কেটে এই বাসা বাড়ি বানিয়ে থাকা। এখানে উইদের আদি বাস। তাদের সাথে লড়াইটা লড়ে লাভ নেই। প্রতি বছরের সব বাঙলা পত্রিকা নিতাম, পড়তাম। শুরুর দিনে এই বড় খাটের ডিভান ভর্তি থাকতো সানন্দা, দেশে। আস্তে আস্তে জিনিস বেড়েছে, সেসব সরে বালাপোস, কার্পেট, চাদর, বালিশ এসব জুটলো ডিভানে। কেউ কেউ অবাক হত ডিভানে বই শুনে। এদিকে এমন মানুষও আছেন যারা এই বই রাখার কদর বোঝেন না। আমার গায়ে সোনা নেই টা বেশি গুরুত্ব পায়। এখন সব বুঝি। কত রকমের মানুষ। সবাই কি আমার মত ক্ষ্যাপা হবে? কিন্তু সেই সানন্দা, দেশ যা ছিল আমার অবসর, কলকাতার খবর, ফ্যাশন,খাবার দাবারের আপডেট দিত, পুজোবার্ষিকীর গল্প উপন্যাসে দিন কাটাতাম সেসব এক সময় বড় বোঝা হয়ে উঠলো। ছেলে মেয়ের মোটা মোটা বই জায়গা কাড়লো। বুক ভাঙ্গে আমার বার বার। মন শক্ত হয়,চোয়াল আরো বেশি। সব গুছিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জে হারি বার বার। একটা বস্তা থেকে কালো কঙ্কালের মত কি বেরুলো? ছবি তুলে হোয়াটস্যাপ ক্লোজ গ্রুপে দিয়ে বললাম, অরিন্দমের দেওয়া প্রথম গিফট। অরিন্দম নিজে লিখলো,মরা চামচিকা? ইচ্ছে করছিল আবার তুলে রাখি সেটুকুই। সেই ববি সিনেমার সিন, সেই ডান্সিং পুতুল কাচের খাপে মনে পড়ে। এক একটা জিনিসে কত স্মৃতি জড়িয়ে লুকিয়ে। চামচিকেটাকে হোয়াটসঅ্যাপ এডিটে আউট লাইন দিয়ে পোস্টালাম। এসব সময় বার বার এক তুমহারে কান্ধে কা তিল মনে আসে বড্ড। মেয়ের কলেজের এম এ ক্লাসের শুরুতে একবার প্রিয় গানের ব্যাখ্যা আর নিজের জীবন দিয়ে মেলাও সেটা যে কেন প্রিয়,ফোনে এসব আলোচনা চলে আমাদের, আমি বলি শুনেই মেরা কুছ সামান? ও বলে হ্যাঁ, কিন্তু মেলাবো কি করে? কেমন বুঝিয়েছিলাম ওকে,সব সময় কি প্রেমে পরলেই এসব গান কথা হয়? আর লিখতে গেলে সব কি সত্যি লিখতেই হবে নাকি? বানিয়ে ফেল বাকিটা। কিন্তু আমি সেটুকু আশাও রাখি যে বানাতে হবে না,কিছু এরকম অভিজ্ঞতা এ বয়সে হয়েছে নিশ্চয়ই। যাইহোক, কি লিখছি নিজেও জানি না। মাথার কিঞ্চিৎ গোলমাল শুরু হলেও হতে পারে। প্রেমিকের দেওয়া প্রথম গিফট, সেটা মরা চামচিকে ভাবা যায়? ওই টেবিল ল্যাম্প নিয়ে বুক দূর দূর করে বাড়ি ঢোকা।কিনলাম না কুড়িয়ে আনলাম সে ফিরিস্তি দাও বাড়ির পাঁচ ভূতকে। ওই আলো জ্বালিয়ে কত চিঠি নেমেছে রাতে, কিছু না হলেও সুইচ টক টাক করে কত অবসর কেটেছে বিরহের। সে আজ মরা চামচিকে। হাসবো না কাঁদবো। আমার হেল্পার সেই পুরানো লক্ষ্মণ মাঝি বোঝে না কেন ছবি তুলছি।