Sunday, August 18, 2019
বিষয় কাশ্মীর
বিষয় কাশ্মীর
অনেকদিন ভাটাইনি, নিজের প্রচন্ড ব্যস্ততা সাথে কিছু মনের খিচখিচানিতে লিখতে মন করছিল না। আমি যখন শিফটিং নিয়ে ব্যস্ত কাশ্মীর নিয়ে কত কি হয়ে গেল। কি হল, কেন হল, ভালো না মন্দ এসব অনুধাবন করার জন্য খুব সামান্য আমি, আর আমার ভাবনা বাকিদের সাথে মিলবেও না হয়ত। তবে ২০০৭-৮ এ কাশ্মীর ভ্রমণ টা জীবনের অন্যকিছু পাওয়ার মধ্যে একটা এটাই ভাবি আমি। খুব কাছ থেকে যে গুলো দেখেছি সেগুলোই বলতে মন করছে। রাজনীতি বুঝি না। ভালো মন্দ এমনিই কম বুঝি।
আমরা চারজন, আমাদের দুদিকের বাবা মা আর সাথে আমাদের বন্ধু পরিবার, প্রণবদা, অজন্তা আর তাদের দুই ছেলে, সব মিলিয়ে বারো জন গেছিলাম। আমাদের বেশির ভাগ থাকার ব্যবস্থা করেন আমার হাওড়া বাড়ির তিন পুরুষের শাল বিক্রেতা রফিক ভাই। রফিকের বাবাও আসতেন এক কালে আমাদের বাড়ি। মা বাড়ি বদলেছে রফিক সেখানেও যায় মাঝে সাঝে। সম্পর্ক কতটা ভরসার হলে সেই সময় রফিক কে দিয়ে আমরা এসব উপকার নিই সেটা বোঝাতে চাইছি আর কি। বেশ মনে আছে রফিক ভাই জম্মু থেকেই আমাদের সাথে যোগাযোগ করে, একটা আলাদা সিম দিয়ে হোটেলের কাগজ টাগজ দিয়ে দেন। সে সময় মোবাইল এত ছড়ায়নি, রোমিং কাটতো বেশ, তাই ওই লোকাল সিম টা যে খুব উপকারে লেগেছিল বলাই বাহুল্য। ডাল লেকের একদম কাছে একটি হোটেল, বলাবাহুল্য তার নামটাও হিন্দু মার্কা কোনো ঠাকুর দেবতা সংক্রান্ত ছিল, সেটির চারটি ঘর আমাদের জন্য আর খুব যথাযথ খরচায় আমরা ছিলাম। আমরা কেউ মহাপুরুষ নই, তাই এই বারো জনের বারো রকম বায়নাক্কা, তায় আবার বেড়াতে এসেছি। ছেলে মেয়েরা কিছুটা বাপ মা বাড়ি পরিবার দ্বারা চালিত। বেশ ছোট তখন। তবু ওতেই বাচ্চারা চিরকাল এডভান্স থাকেই। আবার সাথে প্রাচীন প্রবীণরাও। আর জায়গা কাশ্মীর। সোজাসুজিই বলি, আমার শাশু মা সেই গোত্রে পরেন যেখানে মুসলিম হোটেল? তাদের খাবার? এসব নিয়ে নাক উঁচুপনা ছিল। তাই চারবেলা খাবার জন্য যেমন ভাবতে হয়েছে তেমন আরো অনেক কিছু নিয়েই একটু বুঝে চলতে হয়েছিল। আমরা ফেসবুকে এসে সবাই খুব উদার হয়ে যেতে পারি, কিন্তু ঘরের গল্পগুলো তবু থাকেই। সেই সময় অনেক দিন বন্ধ থাকার পরে আবার কাশ্মীর খুলেছে। তাই ড্রাইভার, হোটেল বয়, শিকারার চালক সবাইকেই আমরা গোগ্রাসে গিলতে চেষ্টা করেছি। আমরা তো সেই সবজান্তা বাঙালি রে বাবা। আমি বেশ ভুলো তাই সব মনে নেই আর, যে টুকু আছে সেগুলো বলি। প্রথম ড্রাইভার ছিলেন একজন টাক মাথা ভদ্রলোক। তাঁকে এক রাশ কৌতূহল নিয়ে কত প্রশ্ন করতে করতে আসি আমরা। কোথাও খুব বেমানান কিছু পাই নি। যে টার যেমন উত্তর তেমনই দিচ্ছিলেন। এরপর ওই হোটেলের মানুষগুলি, সবাই হয়ত মুসলিম কিন্তু কি ভালো মানুষ সে আজো মনে আছে। আমি রোজ খুব ভোরে উঠে ডাল লেকে যেতাম একাই। সামনে রাস্তা পেরোলেই লেক। ওনাদের গেট বন্ধ থাকতো।কিন্তু রোজ খুলে দিতেন আমি গেলেই। সে সময় অর্কুটের জামানা। প্রথম সেই ডিজি ক্যাম হাতে। যা দেখি সব ক্যাম বন্দী করতে মন করে। সূর্যোদয়ের ছবি ভিডিও কিছু ছাড়িনি। রাস্তায় কত মানুষ। কেউ জগিং করছেন, কেউ হাঁটছেন কেউ ছবি তুলছেন আমার মত। তবে স্থানে স্থানে আমাদের ফুল বডি সার্চ বা প্রায় সর্বত্র সিকিউরিটি দাঁড়িয়ে এগুলো ছিলোই। আমরা এক একদিন এক এক দিকে খেতে যেতাম। বড় হোটেল থেকে শুরু করে ছোট গুমটি সবেতেই খেতাম। শাশু মা কে তেমন হলে একেক দিন বৈষ্ণব ধাবাতে খাইয়ে আমরা এদিক সেদিক খেয়েছি। দেখেছি ঠ্যালায় কাবাব এটা সেটা বিক্রি হচ্ছে। আমার নিজের তেমন কোনো ব্যাপার না থাকলেও মা বাবাদের সেই চোখ বোজা শাসনের জন্য ওসব চেখে দেখা হয়নি যদিও সে যাত্রায়। তবে সব জায়গায় এত দারুণ খাবার খেতাম যে কি বলবো। একটা ছোট গুমটি তে ডিমের ওমলেট আর ব্রেডের নেশায় পরে গেছিলাম। সব জায়গাতেই আমার অন্তত টার্গেট ছিল লোকাল মানুষ। বেড়াতে গেলেই নিবেদিতা স্কুল, ভূগোলের মানসীদিকে খুব মনে হয়। দিদি আজ আর নেই, কিন্তু দিদির দৌলতে কিছু শিক্ষা এমন বপন করেছি যে কোনো জায়গায় গেলেই কিছু সার্ভে করা, সেখানের সব গল্প খুব টানে আমায় চিরকাল। সেই নেশাতেই সবার সাথে কথা বলেছি। কেনাকাটার দোকানে গিয়ে যে সব মানুষ পেয়েছি তাঁদের সাথেও খুব বকেছি। কি করে এসব বানায়, এটা ওটা সেটা কত কি। শিকারার চালকদের জীবন ও বুঝতে তাদের নানা প্রশ্ন করেছি। যারা ওই ফুলের পসরা নিয়ে ঘোরেন কিম্বা লেকের মাঝে সেই আখরোট কাঠের কাজ করে চলা বৃদ্ধ মানুষ টি, সবাই আমার কাছে চরম বিস্ময়ের, সবার জীবন পড়ার নেশা কাশ্মীর ট্রিপের অন্যতম আকর্ষণ ছিল আমার। রফিক ভাই তাঁর বাড়িও নিয়ে যান আমাদের।আমার শাশুমার মত গোঁড়া মানুষও ওই কদিনে সব ভুলতে শিখলেন। তাঁদের মিষ্টি ব্যবহার তাঁর মনেও নতুন জানলা খুলে দিয়েছিল। আমার জীবন অনুধাবন করতে ভালো লাগে।তাই দিয়ে মামুনির ব্যাপারটা বুঝি। উনি বরিশালের মেয়ে। ওনার পাঁচ ছ বছরের জীবনে দেখা সেইসব স্মৃতি উনি কি ভুলতে পারেন! যাইহোক, রফিকের বাড়ির আপ্যায়ন জীবনে ভুলবো না। রফিকের বউকে কি সুন্দর দেখতে, বাড়িতে অনেক সদস্য। সবাই কি আন্তরিক। আমাদের জফরান চা খাওয়ালেন। সাথে দারুণ সব খাবারের আয়োজন ছিল। রফিকের বাড়ির আপ্যায়ন আমরা জীবনে ভুলবো না। সেদিন ই রফিকের সাথে তাদের শাল তৈরি কারখানা দেখতে যাই। সাথে ওদের যে হোলসেল দোকান সেখান থেকে কেনাকাটা করি। আমার শাশু মা কেনাকাটা পেলে সব ভুলে যান, তাই এই কদিনে তিনিও ওই ভুলতে বসেছিলেন মুসলিম দোকান, যাবো কি যাবো না ইত্যাদি। এরকম অনেক কথা মনে আসে কাশ্মীর বললেই। এক একটা দিন এক এক দিকে বেড়াতে যাওয়া, সর্বত্র এই মানুষগুলিকে ভীষণ মাটির কাছের, ভীষণ প্রাণখোলা মনে হয়েছে। নিজেদের ছোট ছোট চাওয়া পাওয়া দিয়ে বেশ শান্তিতে কাটানো প্রাণ এঁদের। এই যে এত কার্পেট গালিচা বানানো, তার জন্য ছোট ছোট হাত মাকু ধরে যে ধৈর্য নিয়ে তাঁরা এসব করেন এর মূল্য কি আমরা দিতে পারি? ওই যে আখরোট কাঠের কাজ, বুড়ো মানুষটিকে দেখে কি যে বিস্ময় আর ভালো লাগায় ভরেছিলাম কি বলবো। কি অদ্ভুত নিপুণতা দরকার সে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। এই বেড়ানো ঘিরে কত কত জীবিকা তাঁদের। একটা শান্ত মন ওদের। এর সাথেও লুকিয়ে থাকে কত না বলা জীবন কথা। জীবনের লড়াই রোজ লড়ছেন এঁনারা। সীমান্তের যে সব কাহিনী আমরা বুঝি সেসব কথা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা। এসব নিয়েই কাশ্মীর। সেই কাশ্মীর কে নিয়ে এসব যখন শুনি চারদিকের খবরে বা মিডিয়ায় হতাশ লাগে। আমরা দিতে কতটুকু পারি? খালি নেবার জন্য লোলুপ হাত বাড়াই। কশ্মীরের দুদিকের সবুজ ক্ষেতে দৃষ্টি পড়েছে তাদের, ইয়ে হাসিন বাদিয়া ইয়ে খুলা আসমান, সেখানে এবার শিল্প দেখবো,দেখবো কালো কুন্ডলীর ধোঁয়া বেরুচ্ছে বড় বড় পাইপ থেকে, লিডারের জলে পেট্রোল, নোংরা মিশবে, চারদিকে ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে ভরে যাবে। এর ই তো নাম বিজ্ঞান। সভ্যতা। সব বুঝলাম, আশা রাখি তবু বেঁচে থাকবে ওই নিষ্পাপ মুখগুলোর সরলতা। নির্মল হাসি। রিন রিনে কথা। ডাল লেকে আর ঝপ করে সূর্য ওঠা দেখা যাবে না। অনেক উঁচু বিল্ডিং এর ফাঁক দিয়ে উঠতে উঠতে সূর্য এ আর সেই কুসুমাভা পাবো না। বিশ্বায়ন কাশ্মীরের দোরগোড়ায়। কে আটকায় তাকে?
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment